জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশের ডলার খরচ এক বছরে দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জ্বালানি আমদানিতে ৫ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই ব্যয় বেড়ে হয়েছে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে বাড়তি খরচ হয়েছে ৫ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার।
দেশের মোট আমদানি ব্যয় যেখানে ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেড়েছে, সেখানে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়েছে ১০৭ শতাংশ। ফলে গত অর্থবছরে মোট ৭১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানির মধ্যে প্রতি সাত ডলারের প্রায় এক ডলার খরচ হয়েছে জ্বালানি কিনতে।
বাড়তি ব্যয়ের বড় অংশ গেছে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিতে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৯ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে ছিল প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। এক বছরে ব্যয় বেড়েছে ১০৯ শতাংশ। অর্থাৎ গত অর্থবছরের মোট জ্বালানি আমদানি ব্যয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই গেছে পরিশোধিত জ্বালানি কিনতে। অপরিশোধিত তেল আমদানিতেও ব্যয় বেড়েছে ৯২ শতাংশ।
আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে আমদানির পরিমাণের চিত্রও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৬২ লাখ ২০ হাজার টন জ্বালানি আমদানি হয়েছিল। এর প্রায় ৭৬ শতাংশ ছিল পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ৫৭ লাখ ৪০ হাজার টন। একই সময়ে আগের অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল প্রায় ৫০ লাখ টন।
অর্থাৎ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই আগের পুরো অর্থবছরের আমদানির কাছাকাছি জ্বালানি দেশে এসেছে। একই সময়ে আমদানি ব্যয়ও দ্রুত বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত জ্বালানি, বিশেষ করে ডিজেল, গ্যাস অয়েল ও জেট ফুয়েলের দামের পরিবর্তন এতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
মাসভিত্তিক হিসাবেও ব্যয়ের বড় পার্থক্য দেখা যায়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ৫২ কোটি ডলার। ২০২৫ সালের একই মাসে তা বেড়ে হয় ৭৩ কোটি ডলার। জানুয়ারিতে ৩০ কোটি থেকে বেড়ে হয় ৭০ কোটি ডলার। এপ্রিলে ৩৫ কোটি থেকে বেড়ে ১৩৪ কোটি ডলার এবং জুনে ২৬ কোটি থেকে বেড়ে ১৬০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়।
জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় বাড়লেও সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা কাটেনি। উল্টো গ্যাসের চাপ কম থাকায় শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কারখানাকে উৎপাদন কমাতে হচ্ছে, কোথাও বাড়ছে উৎপাদন খরচ। গ্যাসের সরবরাহ কমলে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি হচ্ছে। পরিবহন খাতেও জ্বালানি ব্যয়ের প্রভাব পড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সমস্যা নিয়ে এরই মধ্যে বিভিন্ন কমিটি ও কারিগরি দল কাজ করেছে। নতুন করে শুধু প্রতিবেদন তৈরি না করে আগের বিশ্লেষণ কাজে লাগানো দরকার। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে করা চুক্তি, সক্ষমতার মূল্য এবং জ্বালানি বিলের বিষয়গুলো নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
ড. জাহিদ হোসেন বলেন, স্থানীয় কোম্পানির পাওনা কেন ডলারের সঙ্গে যুক্ত থাকবে, সেটিও দেখা দরকার। ডলারে দায় বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়ে। সময়মতো বিল পরিশোধ করা না হলে বকেয়া বাড়ে, যার প্রভাব জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহেও পড়তে পারে।
অর্থাৎ সংকট শুধু বিল পরিশোধের নয়, জ্বালানি সরবরাহের পুরো ব্যবস্থাতেই এর প্রভাব পড়ছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দেশে নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আজকের পত্রিকাকে জানান, আমদানি ব্যয় বাড়লেও সে অনুযায়ী জ্বালানি আসছে কম। এভাবে দীর্ঘ মেয়াদে শুধু আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দেশে জ্বালানি পরিস্থিতির সমাধান হবে না। তিনি বলেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি মজুতের সক্ষমতা বাড়ানো, সরবরাহ অবকাঠামো উন্নত করা এবং আমদানির উৎস বহুমুখী করার পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
এদিকে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়লেও প্রবাসী আয় ও বিদেশি ঋণের অর্থ আসায় আপাতত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় চাপ দেখা যায়নি। আইএমএফের হিসাবপদ্ধতি বিপিএম ৬ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন শেষে রিজার্ভ ছিল ২৬ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের জুন শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৩২ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার। তবে জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় দীর্ঘদিন চললে ভবিষ্যতে রিজার্ভে চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।