দেশের ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে বড় সমস্যা খেলাপি ঋণ। খেলাপি ঋণ আদায়ে মামলা করেও ব্যাংকগুলোর কোনো লাভ হচ্ছে না। আইনি জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা এবং স্থগিতাদেশের কারণে ব্যাংকের পাওনা আদায় কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের মার্চ শেষে অর্থঋণ আদালতসহ বিভিন্ন মামলায় আটকে থাকা মন্দ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৮ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা। অথচ আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩ লাখ ২০ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরেই মামলায় আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ বেড়েছে ৩ লাখ ২৭ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা, যা দ্বিগুণের বেশি। আবার চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৫, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২ লাখ ১৯ হাজার ৬৩৩।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, বিভিন্ন কারণে মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এর মধ্যে আছে প্রয়োজনের তুলনায় অর্থঋণ আদালতের সংখ্যা কম হওয়া ও বিচারকের অভাব। আইনি মতামতের জন্য ব্যাংকের আইনজীবীকে পর্যাপ্ত সময় ও সহায়ক জামানতের পর্যাপ্ত দলিলাদি সরবরাহ করতে না পারা। আদালতে শুনানি বারবার পিছিয়ে যাওয়া। পক্ষগুলোর প্রস্তুতি না থাকাসহ বিভিন্ন কারণে অনেক মামলা আটকে থাকে। আরও বড় বাধা হলো স্থগিতাদেশ। অনেক খেলাপি ঋণগ্রহীতা আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে মামলার কার্যক্রম থামিয়ে রাখেন। ফলে ব্যাংকের পাওনা আদায় দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অর্থঋণ আদালতে মামলা চলতে থাকায় এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে আছে; যা প্রায় জাতীয় বাজেটের সমান। এতে ব্যাংকিং খাত যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ব্যাংকিং খাতে মামলায় আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ অর্থ উদ্ধারে এখন ত্বরিতগতিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনা সভার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ৮ ব্যাংকেই ১ লাখ ২৮ হাজার ৭২০টি মামলায় আটকে থাকা খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ১৪ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা।
এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের জনতা ব্যাংকের ১৩ হাজার ১৭টি মামলায় জড়িত অর্থ ১ লাখ ১১ হাজার ৩৬৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা। সোনালী ব্যাংকের ১২ হাজার ৭৪৭টি মামলায় ৩১ হাজার ৫৩৯ কোটি ৪২ লাখ, অগ্রণী ব্যাংকের ২২ হাজার ১৩১টি মামলায় ১৯ হাজার ২৪৪ কোটি ৮৪ লাখ, রূপালী ব্যাংকের ৬ হাজার ৬৪১টি মামলায় ১৪ হাজার ৫১১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা আটকে আছে। এ ছাড়া বিশেষায়িত খাতের বেসিক ব্যাংকের ১ হাজার ২৬০টি মামলায় ১৬ হাজার ৪৩১ কোটি ১৪ লাখ টাকা, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ২১ হাজার ৭০৪টি মামলায় অর্থ ১৪ হাজার ৬৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ৪৮ হাজার ৬০৬টি মামলায় ৫ হাজার ২৩১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ২ হাজার ৬১৪টি মামলায় ২ হাজার ৫৯৫ কোটি আটকে আছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে বের করা ঋণ স্বাভাবিক নিয়মে আদায় করতে পারছে না ব্যাংকগুলো। বারবার সুবিধা ও ছাড় দেওয়ার পরও এসব ঋণ ফেরত দিচ্ছেন না খেলাপিরা। আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে এসব ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা হলেও নিষ্পত্তি হচ্ছে খুবই কম।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, মামলার সংখ্যা বাড়ছে মানে খেলাপি ঋণ আদায়ের চাপ বাড়ছে। কিন্তু নিষ্পত্তি কম হওয়ায় ব্যাংকগুলোতে তারল্যসংকট, মূলধন ঘাটতি এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাঁদের মতে, শুধু মামলা করে এই অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হবে না। প্রয়োজন হবে দ্রুত বিচার, কার্যকর জামানত ব্যবস্থাপনা, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন। অর্থাৎ যাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ করেননি বা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক একদিকে অর্থঋণ আদালতের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে নতুন আদালত গঠন, প্রাইভেট কনসালটেশন ও ওয়ান টাইম সেটেলমেন্টের মতো বেশ কিছু ভালো উদ্যোগ নেওয়ার কথা বললেও বড় ঋণখেলাপিদের ঋণ পুনঃ তফসিল এবং পুনর্গঠনে বড় সুবিধা দিচ্ছে। অর্থাৎ একদিকে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ, অন্যদিকে বড় খেলাপিদের সুবিধা—এই দ্বৈত নীতি সমস্যার সমাধানের বদলে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করছে। প্রকৃত সমাধানের জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকও মনে করছে, আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত না হলে খেলাপি ঋণ কমবে না, বরং ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই খেলাপি ঋণ দ্রুত পুনরুদ্ধার এবং দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান অবিলম্বে ‘অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩’-এর সংশোধনী এবং নতুন ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস করার জন্য জোর তাগিদ দিয়েছেন। গত ৩১ আগস্ট অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে পাঠানো এক চিঠিতে তিনি চলমান সংসদ অধিবেশনেই আইন দুটি উত্থাপন ও পাসের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানান। ব্যাংকিং খাতের সুশাসন জোরদার এবং ব্যাংকের ব্যালান্স শিটের গুণগত মান বাড়াতে এই সংস্কারকে অত্যন্ত জরুরি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
খেলাপি ঋণ আদায় প্রক্রিয়া দ্রুত করতে ‘অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩’-এ পাঁচটি বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে রয়েছে—হাইকোর্টের মর্যাদাসম্পন্ন একটি আপিল ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা, নিলামে ওঠা সম্পদের সংরক্ষিত মূল্য নির্ধারণ, আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে পৃথক রিকভারি অফিসার নিয়োগ, মামলা নিষ্পত্তির আইনি সময়সীমা কমানো এবং আপিল করার ক্ষেত্রে জমা দেওয়ার অর্থের পরিমাণ বাড়ানো। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এসব পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে ঋণসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি এবং ব্যাংকের পাওনা আদায়ের গতি বাড়ানো সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, অর্থঋণ আদালতের ওপর চাপ বাড়ছে। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য গভর্নর অতি দ্রুত অর্থঋণ আদালত আইনের সংশোধন জাতীয় সংসদে পাস করার অনুরোধ জানিয়েছেন। এটি কার্যকর হলে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে বলে আশা করা যায়।