কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে সৌদি আরব থেকে, যার পরিমাণ ৫৮৪ কোটি ৮৮ লাখ মার্কিন ডলার। শীর্ষ ৫ দেশের তালিকায় অন্য দেশগুলো হচ্ছে যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের দেশভিত্তিক তালিকা বিশ্লেষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
শীর্ষ পাঁচ দেশ থেকেই এসেছে মোট রেমিট্যান্সের ৬১ দশমিক ৬১ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, কমসংখ্যক দেশের ওপর এভাবে বেশি রেমিট্যান্সের জন্য নির্ভরশীলতা ঝুঁকিপূর্ণ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩ হাজার ৫৫৮ কোটি ডলার; যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেশি। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা যুক্তরাজ্য থেকে এসেছে ৫০৭ কোটি ডলার। তৃতীয় থেকে পঞ্চম অবস্থানে থাকা সংযুক্ত আরব-আমিরাত, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে যথাক্রমে ৪৫৮ কোটি, ৩৪০ কোটি ও ৩০১ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে এই ৫ দেশ থেকে এসেছে ২ হাজার ১৯২ কোটি ডলার। এটি মোট রেমিট্যান্সের ৬১ দশমিক ৬১ শতাংশ।
বাকি দেশগুলোর মধ্যে ইতালি, কুয়েত, ওমান, কাতার ও সিঙ্গাপুর থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রবাসী আয় এসেছে। এ পাঁচ দেশ থেকে এসেছে প্রায় ৮৯১ কোটি ৪২ লাখ ডলার (২৫%)। সে হিসাবে দেখা যায়, প্রথম ১০টি দেশ থেকে এসেছে মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৮৭ শতাংশ।
মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম দেশ ও শীর্ষ তেল রপ্তানিকারী সৌদি আরবে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। নির্মাণ, পরিবহন, সেবা খাত, গৃহস্থালি কাজসহ বিভিন্ন পেশায় কর্মরত লাখো বাংলাদেশি নিয়মিত তাঁদের কষ্টার্জিত দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন। ফলে রেমিট্যান্স আহরণের তালিকায় দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছে।
দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ স্থায়ী অভিবাসী ও ব্যবসায়ী। তাঁরা শুধু পরিবারের ভরণপোষণ নয়, দেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও অর্থ পাঠিয়ে থাকেন। যুক্তরাজ্যে প্রবাসীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও দক্ষতা ও উপার্জনের হার বেশি বলে এখান থেকে রেমিট্যান্স আসার পরিমাণও উঁচু।
সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশিরা মূলত নির্মাণ, পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন সেবা খাতে কাজ করছেন। আমিরাতে অনেক বাংলাদেশি ব্যবসাও করেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় এ দেশ দুটি থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা রেমিট্যান্সের অঙ্কও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। উচ্চ আয়ের বিভিন্ন পেশায় কর্মরত বাংলাদেশি অভিবাসীদের পাশাপাশি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরাও নিয়মিত দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বেশ কয়েকটি কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে সরকারের প্রণোদনা, হুন্ডির বিরুদ্ধে নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা জোরদার, প্রবাসী আয় পাঠানোর ডিজিটাল পদ্ধতির প্রসার, নতুন শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং বিদেশে দক্ষ কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি আমদানি ব্যয় মেটাতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ভোগব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন নির্মাণ, ক্ষুদ্র ব্যবসায় বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা ও সম্ভাব্য অস্থিরতা এবং দেশে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে দক্ষ কর্মী তৈরি, নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে আরও উৎসাহ দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তাঁরা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, মোট রেমিট্যান্সের অর্ধেকের বেশি মাত্র পাঁচটি দেশের ওপর নির্ভরশীল হওয়াটা অর্থনৈতিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় অদক্ষ ও আধা দক্ষ শ্রমিক বেশি থাকায় সেখানকার রেমিট্যান্স সব সময় স্থিতিশীল থাকে না। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান তুলনামূলক শক্ত হওয়ায় সেখান থেকে আয় বেশি স্থিতিশীলভাবে আসে।
সতর্ক করে দিয়ে মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, প্রধান পাঁচ দেশের অর্থনৈতিক নীতি বা শ্রমবাজারে বড় পরিবর্তন এলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে প্রবাসী আয়ের আকারে। তাই নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।