আগামী ১৮ মাসের মধ্যে মন্দ ঋণ নিষ্পত্তিতে এক্সিট পলিসির আওতায় বিশেষ সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, যা ইউক্রেন ও তুরস্কের মতো দেশে কার্যকর হয়েছে।
মোস্তাকুর রহমান, গভর্নর,বাংলাদেশ ব্যাংক
খেলাপি ঋণের ভারে বিপর্যস্ত দেশের ব্যাংক খাত। আদালতে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, সম্পদ বিক্রিতে জটিলতা এবং ঋণ আদায়ে ধীরগতির কারণে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন এই আইনের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় একটি আধুনিক ও কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে গঠন করা হবে একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি), যা ব্যাংকের মন্দ ঋণ কিনে পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে ঋণ আদায়ে বছরের পর বছর লেগে যায়। এর মধ্যে বন্ধক রাখা সম্পদের মূল্যও কমে যায়। ফলে ব্যাংকগুলো অনেক ক্ষেত্রে পাওনা অর্থ উদ্ধার করতে পারে না। নতুন আইন কার্যকর হলে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ দ্রুত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে। এতে ব্যাংকের ব্যালান্স শিট থেকে খেলাপি ঋণের চাপ কমবে এবং নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বাড়বে। আইনটির খসড়া এরই মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে মতামতের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে।
সম্প্রতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, আগামী ১৮ মাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে মন্দ ঋণ নিষ্পত্তিতে এক্সিট পলিসির আওতায় বিশেষ সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, যা ইউক্রেন ও তুরস্কের মতো দেশে কার্যকর হয়েছে।
গভর্নর বলেন, নতুন আইন কার্যকর হলে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি ব্যাংকের টক্সিক বা খারাপ ঋণ ব্যালান্স শিট থেকে সরিয়ে নিতে পারবে। ২০২৭ সালের মধ্যে এ ধরনের কোম্পানি কার্যকরভাবে কাজ শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গভর্নর আরও বলেন, অযথা মন্দ ঋণ ব্যালান্স শিটে রেখে দেওয়া একধরনের ভুল উপস্থাপন। তাই ব্যাংকগুলোকে রাইট-অফে উৎসাহিত করা হচ্ছে। তবে রাইট-অফ করা হলেও ঋণগ্রহীতারা দায়মুক্তি পাবেন না; ঋণ আদায়ের আইনি প্রক্রিয়া চলবে।
খসড়া আইনে বলা হয়েছে, বর্তমানে খেলাপি, অবলোপন করা ও নন-পারফর্মিং ঋণ পুনরুদ্ধার বা বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির জন্য সমন্বিত কোনো আইন নেই। নতুন আইন কার্যকর হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে এসব সম্পদ বিক্রি, পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে।
আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট (ডিএএমইউ) গঠন করা হবে। তবে প্রশাসনিকভাবে আইন প্রয়োগে স্বায়ত্তশাসিত ক্ষমতা ভোগ করবে। প্রধানের পদমর্যাদা হবে ডেপুটি গভর্নরের সমান; যাঁর ব্যাংকিং বা সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অন্তত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে এবং বয়স ৬৫ বছরের বেশি হলে দায়িত্ব পালন করা যাবে না।
আইনে এক বা একাধিক ট্রাস্ট গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। ব্যাংক থেকে কেনা খেলাপি সম্পদ কোম্পানির নিজস্ব সম্পদ হবে না; আলাদা ট্রাস্টে রাখা হবে। ফলে কোম্পানি দেউলিয়া হলেও ট্রাস্টের সম্পদের ওপর পাওনাদারেরা দাবি করতে পারবেন না। এ ছাড়া খেলাপি সম্পদ শনাক্ত, তথ্য সংগ্রহ, সম্পদ উদ্ধার ও আইনি সমন্বয়ের জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি হিসেবে কাজ করতে হলে লাইসেন্স নিতে হবে এবং নির্ধারিত মূলধন, দক্ষ পরিচালনা পর্ষদ ও ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ মানদণ্ড পূরণ করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদের অন্তত ২০ শতাংশ স্বাধীন পরিচালক রাখতে হবে।
অর্থ পাচার, প্রতারণা বা জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত প্রমাণিত হলে লাইসেন্স বাতিল করা যাবে। তবে আপিলের সুযোগ থাকবে। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ, শেয়ার ও বন্ড ইস্যু এবং যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হলেও স্বার্থের সংঘাত এড়াতে ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আইনটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের অচল সম্পদ পুনরুদ্ধারের নতুন সুযোগ তৈরি হবে এবং ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরবে। তবে আদালতের বাইরে সম্পদ বিক্রি, সম্পদের সঠিক মূল্য নির্ধারণ, ঋণগ্রহীতার অধিকার রক্ষা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে অপব্যবহারের ঝুঁকিও থাকবে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি সফলভাবে কাজ করছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কোনো ব্যাংকের ১০০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ৮০ কোটি টাকায় এই কোম্পানির কাছে বিক্রি করা যেতে পারে। এতে ব্যাংক তাৎক্ষণিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বোঝা কমাতে পারবে। পরে কোম্পানি পুরো অর্থ আদায় করতে পারলে লাভ করবে, আর ব্যর্থ হলে লোকসানের ঝুঁকিও তাদেরই বহন করতে হবে।
মুস্তফা কে মুজেরীর মতে, প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি সরকারি না হয়ে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের ভিত্তিতে পরিচালিত হলে আরও কার্যকর হবে। কারণ, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ থাকলে সিদ্ধান্ত দ্রুত হয়, জবাবদিহি বাড়ে এবং ঋণ পুনরুদ্ধারের সক্ষমতাও বাড়ে। তবে সফলতার জন্য শক্তিশালী আইনি কাঠামো ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যাংকাররাও এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী মনে করছেন। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসহ নানা ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়ছে। আদালতের মাধ্যমে এই সংকটের কার্যকর সমাধান হয়নি। নতুন আইনের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমানো গেলে ব্যাংক খাতের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতিতে।