সবাই চায় ধনী হতে। কিন্তু কেউ পারে, অধিকাংশই পারে না। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময় পকেট ফাঁকা হতে বেশি দেরি লাগে না। অনেককেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শোনা যায়, বেতন পকেটে ঢোকে ৩০ দিন পরপর, কিন্তু খরচ হতে লাগে না তিন দিন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১০টি ভুলের কারণে বেশির ভাগ মধ্যবিত্ত কখনোই ধনী হতে পারে না। আসুন জেনে নেওয়া যাক, কী সেই ১০ ভুল—
প্রতিদিন বাইরে এক কাপ দামি কফি, সপ্তাহে কয়েকবার রেস্তোরাঁয় খাওয়া কিংবা অপ্রয়োজনীয় অনলাইন শপিং—এগুলো আপাতদৃষ্টিতে খুব সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু এই ছোট ছোট খরচগুলো মোটের ওপর অনেক বড় অঙ্কে দাঁড়ায়। ধরা যাক, আপনি প্রতি সপ্তাহে অপ্রয়োজনে ১ হাজার টাকা খরচ করেন। বছরে এই খরচ ৫২ হাজার টাকায় পৌঁছায়! এই টাকাটা আপনি সঞ্চয় বা বিনিয়োগ করতে পারতেন। মনে রাখতে হবে, অপ্রয়োজনীয় খরচ ধনী হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা। তবে মানসিক প্রশান্তির জন্য কোনো খরচ যদি বাজেটের অংশ হয়, তবে তা ভিন্ন কথা।
স্ট্রিমিং সার্ভিস (যেমন নেটফ্লিক্স, হইচই), দামি জিমের মেম্বারশিপ কিংবা বিভিন্ন অ্যাপের প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন—এই খরচগুলো মাসের পর মাস পকেট কাটছে। নিজেকে প্রশ্ন করুন, এগুলো আপনার আসলেই প্রয়োজন কি না? দামি জিমের পরিবর্তে পার্কে হাঁটা ও ব্যায়াম বেছে নেওয়া যেতে পারে। টাকা যখন কম থাকে, তখন এ ধরনের মাসিক খরচ কমিয়ে জীবনাচরণকে সহজ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
অনেকেই ক্রেডিট কার্ড দিয়ে বিলাসিতার জিনিস কেনেন। আপনি যদি মাসের শেষে পুরো টাকা পরিশোধ করতে না পারেন, তবে আপনাকে ক্রেডিট কার্ডের ওপর উচ্চ হারে সুদ দিতে হয়। এতে পণ্যের আসল দামের চেয়ে আপনি অনেক বেশি টাকা খরচ করে ফেলেন। ক্রেডিট কার্ডের অপরিকল্পিত ব্যবহার আপনাকে আয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় করতে বাধ্য করতে পারে, যা ঋণের জালে জড়ানোর প্রথম ধাপ।
প্রতি বছর হাজার হাজার নতুন গাড়ি বিক্রি হয়, কিন্তু খুব কম লোকই নগদে কিনতে পারেন। গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় মনে রাখবেন, ‘গাড়ির কিস্তি দিতে পারা’ মানেই ‘গাড়ি কেনার সামর্থ্য থাকা’ নয়। এ ছাড়া, গাড়ি একটি অবচয়যোগ্য সম্পদ—কেনার পর থেকেই এর দাম কমতে থাকে। ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনে তার ওপর সুদ দেওয়া মানে দ্বিগুণ লোকসান গোনা।
বাড়ি সবারই স্বপ্ন। কিন্তু ‘বড় বাড়ি মানেই ভালো বাড়ি’—এই ধারণা ভুল। আপনার যদি ছোট পরিবার হয়, তবে বিশাল বাড়ি কেনার মানে হলো বেশি ট্যাক্স, বেশি রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এবং বেশি ইউটিলিটি বিল। বাড়ি কেনার আগে মাসিক কিস্তি ছাড়াও এই আনুষঙ্গিক খরচগুলোর কথা ভাবতে হবে। বড় বাড়ি কিনে কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে মাসিক বাজেট যেন হুমকির মুখে না পড়ে।
বাসার ওপর ঋণ বা হোম ইক্যুইটি লাইন অব ক্রেডিট সুবিধা ব্যবহার করে বাড়ির ইক্যুইটিকে ক্রেডিট কার্ডের মতো ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ। এর মাধ্যমে আপনি অপ্রয়োজনে বাড়ির মালিকানা অন্যের হাতে তুলে দিচ্ছেন এবং তার ওপর সুদ দিচ্ছেন। বাড়ি সংস্কার বা বড় কোনো প্রয়োজনীয় কাজে রিফাইন্যান্সিং বা হোম ইক্যুইটি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে অযথা খরচ বা উচ্চ সুদের ঋণ শোধ করতে এটি ব্যবহার করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
অনেকেই মাস শেষ না হতেই আয়ের পুরো টাকা খরচ করে ফেলেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন না। এটি আপনাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। চাকরি হারানো, অসুস্থতা বা অন্য কোনো জরুরি অবস্থায় এই মানসিকতা আপনাকে বড় বিপদে ফেলবে। ফিন্যান্সিয়াল প্ল্যানারদের মতে, অন্তত তিন মাসের খরচের সমপরিমাণ টাকা ‘জরুরি তহবিল’ হিসেবে আলাদা রাখা উচিত। সঞ্চয়হীন জীবন ঋণের চক্রে আটকে ফেলতে পারে।
আপনার টাকা যদি আপনার জন্য কাজ না করে (যেমন বাজারে বা অন্য কোনো আয়ের উৎসে বিনিয়োগ), তবে আপনাকে সারা জীবন কাজ করে যেতে হতে পারে। ধনী হওয়ার মূল মন্ত্র হলো বিনিয়োগ। ট্যাক্স-সুবিধা পাওয়া যায় এমন অবসরের অ্যাকাউন্ট বা এমপ্লয়ার-স্পন্সরড প্ল্যানগুলোতে নিয়মিত টাকা রাখুন। বিনিয়োগের সময় আপনার লক্ষ্য এবং ঝুঁকির ক্ষমতা বিবেচনা করুন।
অনেকেই ভাবেন, বেশি সুদের ঋণ পরিশোধ করতে অবসরের সঞ্চয় ব্যবহার করা বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু এটি ভুল ধারণা। প্রথমত, আপনি চক্রবৃদ্ধি সুদের ক্ষমতা হারান। দ্বিতীয়ত, অবসরের আগে টাকা তুললে আপনাকে পেনাল্টি দিতে হতে পারে। দেনা শোধ করার পর অনেকেই আবার আগের মতোই খরচ করা শুরু করেন। ফলে আবার দেনার জালে জড়ান। সঞ্চয় ভাঙার চেয়ে দেনা শোধ করতে আপনার জীবনাচরণ পরিবর্তন করা জরুরি।
আপনার আর্থিক ভবিষ্যৎ আজকের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় কিংবা স্ট্রিমিং সার্ভিসে অনেক সময় নষ্ট করে ফেলি। কিন্তু ব্যক্তিগত আর্থিক ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা করতে আমরা বিন্দুমাত্র সময় ব্যয় করি না। ব্যক্তিগত এই বিচার-বিশ্লেষণ না করার জন্য আমরা জানতেই পারি না, বর্তমানে কোথায় আছি, আর ভবিষ্যতে কোথায় যেতে চাই।
আর্থিক সচ্ছলতা একদিনে আসে না। এর জন্য প্রয়োজন শৃঙ্খলা এবং সচেতনতা। ওপরের ১০টি ভুল এড়িয়ে চলার মাধ্যমে আর্থিক ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করা যেমন সম্ভব, একই সঙ্গে ধনী হওয়ার পথে যাত্রা শুরু করাও সম্ভব।
তথ্যসূত্র: ইনভেস্টোপেডিয়া