দেশে বিদেশি ঋণ যত আসছে, তবে তার বড় অংশই চলে যাচ্ছে পুরোনো ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে। ফলে বৈদেশিক অর্থায়ন থেকে নতুন করে অর্থনীতিতে যে সহায়তা পাওয়ার কথা, তা ক্রমেই কমে আসছে। এরই মধ্যে বিদেশি ঋণের অর্থছাড় ও নতুন প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়ার বিপরীতে ঋণ পরিশোধের চাপ দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) থেকে গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে সরকারের বৈদেশিক দায় পরিস্থিতির এমন চিত্রই উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে বাংলাদেশের অনুকূলে বিদেশি ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে মোট অর্থছাড় হয়েছে ৪৫৭ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার ডলার। একই সময়ে বাংলাদেশকে সুদ ও আসল মিলিয়ে পরিশোধ করতে হয়েছে ৪১৩ কোটি ২৩ লাখ ডলার। অর্থাৎ যে অর্থ বিদেশি সহায়তা হিসেবে এসেছে, তার প্রায় পুরোটাই ঋণ পরিশোধে চলে গেছে।
গত অর্থবছরের একই সময়ে বিদেশি সহায়তার অর্থছাড় ছিল ৫৬০ কোটি ৮১ লাখ ৬০ হাজার ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে অর্থছাড় কমেছে ১০০ কোটি ডলারের বেশি।
শুধু অর্থছাড় নয়, নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতিতেও বড় ধরনের ভাটা পড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে মোট ৪২২ কোটি ৫৩ লাখ ৯০ হাজার ডলারের ঋণ প্রতিশ্রুতি পেয়েছে সরকার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৫৪৮ কোটি ৮৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার।
অন্যদিকে ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েছে রেকর্ড মাত্রায়। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-মে সময়ে বিভিন্ন ঋণদাতা দেশ ও সংস্থাকে সুদ-আসল মিলিয়ে ৪১৩ কোটি ২৩ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে, যা টাকার অঙ্কে প্রায় ৫০ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। দেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরের ১১ মাসে বিদেশি ঋণ পরিশোধের এটিই সর্বোচ্চ পরিমাণ।
এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পুরো বছরজুড়ে বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল মিলিয়ে পরিশোধ করা হয়েছিল ৩৭৮ কোটি ৪৬ লাখ ১০ হাজার ডলার বা ৪৫ হাজার ৬৭৬ কোটি ৮ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৩৩৭ কোটি ডলার। ফলে ঋণ পরিশোধের চাপ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছর শেষে বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ৪৫০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টানেলের মতো বড় প্রকল্পের ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় সুদ ও কিস্তি পরিশোধের চাপ বেড়েছে। পাশাপাশি ডলারের মূল্যবৃদ্ধিও সরকারের ব্যয় বাড়িয়েছে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে ঋণের আসল বাবদ ২৬৮ কোটি ৪৩ লাখ ডলার এবং সুদ বাবদ প্রায় ১৪৫ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। একই সময়ে ঋণ হিসেবে এসেছে ৪১৪ কোটি ৩৩ লাখ ৪০ হাজার ডলার এবং অনুদান হিসেবে পাওয়া গেছে ৪৩ কোটি ৩৮ লাখ ১০ হাজার ডলার।
বিদেশি সহায়তার অর্থছাড়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অংশ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক, ৯৬ কোটি ডলার। এরপর রাশিয়া ৯৩ কোটি ডলার, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ৭৮ কোটি ডলার, চীন ৫৩ কোটি ডলার, জাপান ৪৩ কোটি ডলার এবং ভারত ২৫ কোটি ডলার অর্থ ছাড় করেছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, এ পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা, ঋণ গ্রহণে সতর্কতা এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক প্রকল্পে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়াতে হবে।