ভারত সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যে কড়াকড়ি ও নানা শর্তারোপের প্রভাবে লালমনিরহাটের পাটগ্রামের বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে ভাটা পড়েছে। এতে একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব আয় কমেছে, অন্যদিকে স্থলবন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান এবং আয়রোজগারেও টান পড়েছে।
বুড়িমারী শুল্ক স্টেশন (এলসি) ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ-ভুটান ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টের আওতায় ভারতের ট্রানজিট রুট ব্যবহার করে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে স্থাপিত হয়। ২০০২ সালের ১২ জানুয়ারি এটিকে পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দরে রূপান্তর করা হয়। ১১ দশমিক ১৫ একর জমির এ বন্দর দিয়ে ভুটান, ভারত ও নেপালের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
এ স্টেশন দিয়ে আগে বিভিন্ন পণ্য আমদানি হলেও গত কয়েক বছর ধরে পাথরই সর্বাধিক আমদানি হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ বন্দর দিয়ে মোট ২৪ লাখ ৪২ হাজার ৯৯৯ টন পণ্য আমদানির মধ্যে পাথর ছিল ২২ লাখ ৩০ হাজার ৬২৯ টন (প্রায় ৯১ দশমিক ৩১ শতাংশ)। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট আমদানি বেড়ে ২৬ লাখ ৮১ হাজার ১০৯ টনে দাঁড়ায়। এর মধ্যে পাথর ২৪ লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৪ টন (৯০ দশমিক ৮৮ শতাংশ)।
এসব অর্থবছরে পাথর ও খনিজজাত পণ্যের পাশাপাশি ভারত থেকে বিভিন্ন কৃষি এবং শিল্পপণ্যের আমদানিও কমেছে। এর মধ্যে নদীর পাথর, চুনাপাথরের বোল্ডার ও টুকরা, ভাঙা পাথর, জিপসাম পাউডার, ডলোমাইটের টুকরা, বড় এলাচ, ফেস ভিনিয়ার, এমএস ব্লেড, সংরক্ষিত ফল, বাদাম ও ভোজ্য উদ্ভিজ্জাংশ এবং কুইকলাইমের আমদানি কমেছে।
বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যে নতুন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতের স্থলবন্দরভিত্তিক আমদানি বিধিনিষেধ। ২০২৫ সালের ১৭ মে ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফরেন ট্রেড (ডিজিএফটি) বাংলাদেশি তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ফল ও কার্বনেটেড পানীয়, তুলা ও তুলার বর্জ্য, প্লাস্টিক-পিভিসি পণ্য এবং কাঠের আসবাব আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে।
এতে পশ্চিমবঙ্গের চ্যাংড়াবান্দা স্থলবন্দর দিয়ে এসব পণ্য আমদানি বন্ধ হয়ে বুড়িমারী দিয়ে রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে ২ লাখ ১ হাজার ৭৩৫ টন পণ্য রপ্তানি হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ১ লাখ ৩৬ হাজার ১৬৫ টনে দাঁড়ায়। অর্থাৎ, এক বছরে রপ্তানি কমেছে ৬৫ হাজার ৫৭০ টন (প্রায় ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ)।
এদিকে বুড়িমারী স্থল শুল্ক স্টেশন দিয়ে উচ্চ শুল্কের ১৩টি পণ্যের আমদানি নিষেধাজ্ঞা ও পাথরনির্ভর বাণিজ্যের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ হচ্ছে না। এতে এনবিআরের নির্ধারিত রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রাও গত সাত অর্থবছরে অর্জিত হয়নি। ব্যবসায়ী, শ্রমিক, বন্দর ও শুল্ক স্টেশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রসঙ্গত, উচ্চ শুল্কের ১৩টি নিষিদ্ধ আমদানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে—সুতা, ডুপ্লেক্স বোর্ড, নিউজপ্রিন্ট, ক্রাফট পেপার, সিগারেট পেপারসহ সব প্রকার পেপার ও পেপার বোর্ড, গুঁড়া দুধ, টোব্যাকো (প্রতিষ্ঠিত মূসক নিবন্ধিত বিড়ি উৎপাদনকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান কর্তৃক কাঁচামাল হিসেবে আমদানীয় তামাক ডাঁটা বাদে), রেডিও-টিভি পার্টস, সাইকেল পার্টস, ফরমিকা শিট, সিরামিকওয়্যার, স্যানিটারিওয়্যার, স্টেইনলেস স্টিলওয়্যার, মার্বেল স্লাব অ্যান্ড টাইলস এবং মিক্সড ফেব্রিকস।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৪৭ কোটি ৮৯ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৮৭ কোটি ৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা; ঘাটতি ৬০ কোটি ৮০ লাখ ৫২ হাজার টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১২৪ কোটি ১১ লাখ ৩ হাজার টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৯০ কোটি ৬৬ লাখ ৮৩ হাজার টাকা; ঘাটতি ৩৩ কোটি ৪৪ লাখ ২০ হাজার টাকা।
লালমনিরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি সেলিম সবুজ বলেন, যুদ্ধ ও জ্বালানিসংকটের প্রভাবে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এতে বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়েও ব্যবসা-বাণিজ্য কমেছে। এর প্রভাব ব্যবসায়ীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপর পড়েছে।
বুড়িমারী স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান প্রধান রাজু বলেন, ভারতের চ্যাংড়াবান্দা স্থলবন্দরে পাথরের দাম বৃদ্ধি, আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো ও ব্যাংক হতে চাহিদামতো এলসি না পাওয়া এবং ব্যাংকের সুদ বাড়ানোয় বাণিজ্য কমেছে।
বুড়িমারী স্থলবন্দরের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান রুবি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী অজয় কুমার ধর বলেন, রাস্তা খারাপ হওয়ায় বুড়িমারী থেকে পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ বেশি হয়। গাড়িপ্রতি ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হওয়ায় ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
বাণিজ্য কমায় স্থলবন্দরের শ্রমজীবী মানুষদের জীবিকাতেও টান পড়েছে।
বন্দরে পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ করেন মহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, কাজ অনেক কমেছে। এখন শুধু ভুটানের গাড়ি আসে। ভারতের গাড়ি আসে না। এতে কিছু শ্রমিক কাজ পান, অনেকেই পান না। আগে দৈনিক ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা আয় হলেও এখন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা হয়। সংসার চালানো যাচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভারতের চ্যাংড়াবান্দা স্থলবন্দরের একজন রপ্তানিকারক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য কমেছে—এর প্রধান কারণ হচ্ছে দুটি দেশের সরকারের সম্পর্কে কিছুটা অবনতি। ভারত সরকার কিছু পণ্য আমদানিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে, যেগুলো এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট হয় না। পারমিশন নিতে হয়। তারা কখনো পারমিশন দিচ্ছে, কখনো দিচ্ছে না। নতুন গভর্নমেন্ট (পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার) আসার পর থেকে স্থানীয় নদীগুলো থেকে পাথর নিতে দিচ্ছে না। শুধু ভুটান থেকে পাথর যাচ্ছে, ভারত থেকে কোনো পাথর যাচ্ছে না। গাড়িতে ওভার লোডিং-সংক্রান্ত একটা সমস্যাও রয়েছে।
বুড়িমারী স্থলবন্দরের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফারুক হোসেন বলেন, ‘নানা প্রতিবন্ধকতায় ব্যবসা কমেছে। দীর্ঘদিনেও বুড়িমারী স্থল শুল্ক স্টেশনটিকে কাস্টম হাউস ঘোষণা করা হয়নি। বাণিজ্য সহজীকরণে বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে রংপুরের পায়রাবন্দ পর্যন্ত মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যবস্থা নিতে সরকার এবং আমাদের জেলার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মহোদয়ের নিকট অনুরোধ করছি।’
বুড়িমারী স্থল শুল্ক স্টেশনের (কাস্টমস) সহকারী কমিশনার (এসি) মতলেবুর রহমান বলেন, বুড়িমারী স্থল কাস্টমস স্টেশনে প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামো রয়েছে। ১৩টি পণ্যের আমদানিতে অনুমতি দেওয়া হলে এ বন্দরে অনেক বেশি রাজস্ব আয় করা সম্ভব।