বেসরকারি পাটকল লাভের মুখ দেখলেও বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনে থাকা পাটকলগুলো বছরের পর বছর লোকসান গুনছিল। লোকসানের বোঝা বইতে না পেরে একপর্যায়ে ২৪ হাজার ৮৮৬ জন স্থায়ী শ্রমিককে স্বেচ্ছা অবসরে (গোল্ডেন হ্যান্ডশেক) পাঠানো হয়। এর পর ২০২০ সালের ১ জুলাই ২৫টি পাটকল বন্ধ করে দেয় সরকার। এর মধ্যে ২২টি পাটকল ও ৩টি নন-জুট কারখানা ছিল।
পাটকল বন্ধ হওয়ার পর সেগুলো বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে তৎকালীন সরকার। এখন পর্যন্ত ১৪টি পাটকল বেসরকারি খাতে ইজারা দিয়েছে বিজেএমসি। এর মধ্যে ৯টি উৎপাদনে গেছে। এতে সাড়ে ৯ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে বলে জানালেন বিজেএমসির কর্মকর্তারা।
আজ মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে ইজারার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হবে।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর খুলনা ও দিনাজপুরে তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল এবার ইজারা পাচ্ছে দুই শিল্পগোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল ও হ্যামকো গ্রুপ। বন্ধ মিলগুলোতে তৈরি পোশাক, জুতা, খেলনা, আসবাব, বৈচিত্র্যময় পাটপণ্য, লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদনে ১ হাজার ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে এই দুই শিল্পগোষ্ঠী। এর ফলে মোট ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ খুলনার দিঘলিয়ার স্টার জুট মিলস এবং সিরাজগঞ্জের রায়পুরের জাতীয় জুট মিলস ইজারা পাচ্ছে। অন্যদিকে খুলনার খালিশপুরের প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিল ৩০ বছরের জন্য ইজারা পাচ্ছে হ্যামকো গ্রুপের আবদুল্লাহ ব্যাটারি কোম্পানি (প্রাইভেট) লিমিটেড।
এ বিষয় বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) মুখ্য পরিচালন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মামনুর রশিদ বলেন, খুলনা ও দিনাজপুরের তিনটি পাটকল প্রাণ-আরএফএল ও হ্যামকো গ্রুপকে ইজারা দেওয়া হচ্ছে। আজ মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে ইজারার আনুষ্ঠানিক চুক্তি হবে।
১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত খুলনার স্টার জুট মিলস ও ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিল ইজারা নিয়ে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন কবরে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী এই দুটি কারখানায় প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে। এতে সাড়ে ১১ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
জানা গেছে, স্টার জুট মিলসের ৫৬ একর জমির মধ্যে প্রায় ৪৬ একর ইজারা পাচ্ছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। সেখানে উচ্চমূল্যের পাটজাত পণ্য, আসবাব, মিডিয়াম ডেনসিটি ফাইবার (এমডিএফ) বোর্ডসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করতে প্রায় ২৫০ কোটি বিনিয়োগ করবে। এতে ৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কারখানাটি থেকে বার্ষিক ৫০০ কোটি টাকা পণ্য বিক্রির পরিকল্পনা রয়েছে শিল্পগোষ্ঠীটির।
অন্যদিকে সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলসের ৭৫ একরের মধ্যে প্রায় ৩৮ একর জমি ইজারা পাচ্ছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। সেখানে তারা তৈরি পোশাক, হস্তশিল্প, ব্যাগ, জুতা ও খেলনা উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের পাশাপাশি কাঁচামাল, প্যাকেজিং ও পণ্য সংরক্ষণাগার নির্মাণে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। এতে সাড়ে ৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কারখানাটির বার্ষিক টার্নওভার বা লেনদেন হবে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, কারখানা দুটিতে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি রপ্তানির জন্য পণ্য উৎপাদন করা হবে। আমরা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই উৎপাদন শুরু করব।’
তিনি আরও বলেন, জায়গা কিনে সেটি উন্নয়ন করে কারখানা নির্মাণ করতে সাধারণত তিন-পাঁচ বছর সময় লেগে যায়। তার বিপরীতে রেডি (প্রস্তুত) জমি পেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে উৎপাদনে যাওয়া যায়। এতে সময়ের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ অর্থও সাশ্রয় হয়।
এদিকে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত রাজশাহী টেক্সটাইল মিল এবং রাজশাহী জুট মিলও সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারত্বে (পিপিপি) চালু করেছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। দুটি কারখানায় এখন পর্যন্ত সাড়ে তিন হাজার মানুষ কাজ করছেন। শিগগিরই এই সংখ্যা আরও বাড়বে।
১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত খুলনার প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলের প্রায় ৫৬ একর জমির মধ্যে প্রায় ৫০ একর ইজারা পাচ্ছে হ্যামকো গ্রুপ। তারা সেখানে ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে দুটি কারখানা স্থাপন করবে। তাতে কর্মসংস্থান হবে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মানুষের।
হ্যামকো গ্রুপের কোম্পানি সচিব রেজাউল করিম বলেন, ‘বিজেএমসি আমাদের তিন মাসের মধ্যে বন্ধ পাটকলটি বুঝিয়ে দেওয়ার আশ্বাস প্রদান করেছে। তারপর আমরা কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করব। আমাদের প্রত্যাশা, এক বছরের মধ্যে আমরা দুটি কারখানাই চালু করতে পারব।’
হ্যামকো গ্রুপের কর্মকর্তারা জানান, প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলে দুটি কারখানার মধ্যে একটি হবে পাটের বিশেষায়িত ম্যাট্রেস উৎপাদন কারখানা। এই ম্যাট্রেস বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হবে। চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে কারখানাটি করবে হ্যামকো। এ ছাড়া লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনের একটি কারখানা স্থাপন করবে তারা। বিদেশ থেকে ব্যাটারির সেল আমদানি করে সেখানে ব্যাটারি উৎপাদন হবে।