জীবনবিমা কোম্পানিগুলোর হাতে থাকা গ্রাহকদের দীর্ঘমেয়াদি তহবিল বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে আয় করা হয়। এই আয় থেকে ভবিষ্যতে পলিসিধারীদের দাবি, বোনাস ও অন্যান্য সুবিধা পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের বিপরীতে জীবনবিমা খাতের নামমাত্র আয় পরিলক্ষিত হয়েছে।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) প্রথম প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-মার্চ শেষে দেশের জীবনবিমা কোম্পানিগুলোর মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা। এ সময়ে এসব বিনিয়োগ থেকে আয় হয়েছে ৯৬১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে মোট বিনিয়োগের বিপরীতে আয় হয়েছে ২ দশমিক ২৬ শতাংশ। সহজ হিসাবে, ১০০ টাকা বিনিয়োগ করে আয় হয়েছে ২ টাকা ২৬ পয়সা।
জীবনবিমা খাতের জন্য বিনিয়োগ আয় গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, গ্রাহকদের কাছ থেকে দীর্ঘ সময় ধরে সংগ্রহ করা প্রিমিয়ামের অর্থ কোম্পানিগুলোর তহবিলের মূল ভিত্তি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অর্থ কোথায় বিনিয়োগ হচ্ছে এবং সেখান থেকে কতটা আয় হচ্ছে, দুটিই নিয়ন্ত্রক সংস্থার গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। যেসব বিনিয়োগ দীর্ঘদিন অলস পড়ে আছে বা আয় দিচ্ছে না, সেগুলো চিহ্নিত করে অনুৎপাদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ থেকে অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ দরকার। গ্রাহকের আস্থা ফেরাতে নতুন পলিসি বিক্রির পাশাপাশি পুরোনো পলিসির দাবি সময়মতো পরিশোধ এবং অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি।
বিমা বিশেষজ্ঞ ও গার্ডিয়ান লাইফ ইনস্যুরেন্সের সাবেক সিইও জিয়াউর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, তিন কারণে বিনিয়োগ থেকে আয় কমেছে। কোম্পানিগুলো জমিতে বিনিয়োগ করেছে, সরকারি ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ কম এবং শেয়ারে বিনিয়োগ করা হয়েছে।
৪২ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকার বিনিয়োগের মধ্যে ৩২ হাজার ২১৫ কোটি টাকা রয়েছে মেটলাইফ বাংলাদেশ, ন্যাশনাল লাইফ, ডেলটা লাইফ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জীবন বীমা করপোরেশনের হাতে। অর্থাৎ মোট বিনিয়োগের প্রায় ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ এই চার প্রতিষ্ঠানের।
এর মধ্যে মেটলাইফের বিনিয়োগ ১৮ হাজার ৮০৭ কোটি টাকা এবং তিন মাসে আয় মাত্র ৪৫৩ কোটি টাকা। ন্যাশনাল লাইফের ৬ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ থেকে আয় ১৪৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ডেলটা লাইফের ৪ হাজার ৩ কোটি টাকা থেকে আয় ৯৭ কোটি ১১ লাখ টাকা। জীবন বীমা করপোরেশনের ২ হাজার ৯৬৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ থেকে আয় ৫৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
বাকি ৩২ কোম্পানির সম্মিলিত বিনিয়োগ ১০ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা। এসব কোম্পানি বিনিয়োগ থেকে আয় করেছে ২০৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
কয়েকটি কোম্পানির বিনিয়োগে আয় প্রায় নেই। ফারইস্ট ইসলামী লাইফের ১ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ থেকে তিন মাসে আয় হয়েছে ২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, অর্থাৎ প্রায় শূন্য দশমিক ১২ শতাংশ। পদ্মা ইসলামী লাইফের ১৭৫ কোটি টাকার বিপরীতে আয় ২ কোটি ২০ লাখ টাকা। বায়রা লাইফের প্রায় ৬০ কোটি টাকা থেকে আয় এসেছে ৬৮ লাখ টাকা।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিনিয়োগের ধরন, সম্পদের মান, মেয়াদ, বাজার পরিস্থিতি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার কারণে আয় কমতে পারে। তাই শুধু বিনিয়োগ ও আয়ের অঙ্ক দিয়ে কোম্পানির সার্বিক অবস্থা বিচার করা ঠিক নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের বিপরীতে ধারাবাহিকভাবে কম আয় নজর দেওয়ার বিষয়।
বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক এস এম নুরুজ্জামান বলেন, প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংকের এফডিআর ও শেয়ার বিনিয়োগ থেকে আয় কমেছে। তবে বছরের শেষে ভালো মুনাফার প্রত্যাশা করছেন তিনি।
আইডিআরএর চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, জমি কেনা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন কোনো কোম্পানি নিজের ইচ্ছেমতো জমিতে বিনিয়োগ করতে পারছে না। বিনিয়োগের গাইডলাইন মানার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে।