জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবার এবং আহতদের সহায়তার জন্য গঠিত জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন তীব্র আর্থিক সংকটে পড়েছে। টাকা না থাকায় আহত জুলাই যোদ্ধাদের অনেককে এখনো সহায়তা দেওয়া যায়নি। ফাউন্ডেশনের কর্মীরাও পাঁচ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। এমনকি শাহবাগে ফাউন্ডেশনের কার্যালয়ের ১২ মাসের ভাড়া প্রায় ২৪ লাখ টাকা বকেয়া পড়েছে। ফাউন্ডেশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
ফাউন্ডেশনের সূত্র জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার বিভাগ বেতন-ভাতা, প্রশাসনিক ব্যয়, অফিস ভাড়া, যানবাহন, জ্বালানি, ভ্রমণ এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের জন্য ফাউন্ডেশনকে ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল।
সেই অর্থ দিয়ে দুই অর্থবছরের কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সেই তহবিলও শেষ হওয়ার পথে।
ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের সহায়তার জন্য প্রয়োজন ছিল ৩৮৩ কোটি টাকা। কিন্তু সরকার থেকে ফাউন্ডেশন পেয়েছে ১০০ কোটি টাকা এবং বেসরকারি সহায়তা পেয়েছে ২০ কোটি টাকা। বর্তমানে সরকারের গেজেটভুক্ত জুলাই শহীদের সংখ্যা ৮৪৩ এবং আহত জুলাই যোদ্ধা ১৪ হাজার ৩৭০ জন। ফাউন্ডেশন ৮৩১টি শহীদ পরিবারকে ৫ লাখ টাকা করে প্রায় ৪২ কোটি টাকা এবং ৬ হাজার ১২৭ জন আহত ব্যক্তিকে প্রায় ৭৮ কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে। অর্থাৎ মোট ১২০ কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে। আর্থিক সংকটে আহত প্রায় ৮ হাজার জুলাই যোদ্ধাকে এখনো সহায়তা দেওয়া যায়নি। শহীদ পরিবার এবং আহত মিলিয়ে প্রায় ৪ হাজার ৯৩৮ জনের তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও সংরক্ষণ করা হয়েছে।
ফাউন্ডেশন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, আর্থিক সংকটের মধ্যেও প্রায় ১৫০টি পরিবারকে পুনর্বাসনের আওতায় আনা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতায় ২৭টি পরিবারকে পুনর্বাসনে ৪১ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
অর্থাভাবে ফাউন্ডেশনের ৩৯ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতাও আটকে আছে। কর্মীদের ঈদের বোনাস দিতে ঈদের আগে ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কামাল আকবর ব্যক্তিগতভাবে ফাউন্ডেশনকে ১০ লাখ টাকা বিনা সুদে ঋণ দেন। তিনিও কয়েক মাস বেতন নিচ্ছেন না।
জানা গেছে, বেতন না পাওয়ায় কয়েকজন কর্মী অবৈতনিক ছুটিতে আছেন। কেউ কেউ নিয়মিত অফিস করছেন না, আবার কেউ কেউ চাকরি ছেড়েছেন।
জানতে চাইলে ফাউন্ডেশনের সিইও কামাল আকবর আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ভালো চাকরি পেয়ে কয়েকজন ইতিমধ্যে চলে গেছেন। বর্তমানে প্রায় ৩০ জন সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। সরকারের কাছ থেকে বরাদ্দ পাওয়া যাবে—এমন আশায় অনেকে এখনো প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আছেন।’ অর্থসংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতির কারণে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ আসতে দেরি হচ্ছে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় অনেক প্রয়োজনীয় বিষয়ও সময়মতো বাস্তবায়িত হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, ‘শুধু আনুষ্ঠানিক বৈঠক নয়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত লিখিত ও মৌখিক যোগাযোগ করা হচ্ছে। আমাদের টাকা নেই, কিন্তু কাজ করার ইচ্ছার কোনো অভাব নেই। অনেক প্রকল্প প্রস্তুত। শুধু অর্থের অভাবে সেগুলো শুরু করা যাচ্ছে না।’
জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বরাবর গত ৯ জুন ফাউন্ডেশনের সার্বিক অবস্থা তুলে ধরে লিখিত আবেদন করেন ফাউন্ডেশনের সিইও। নাহিদ ইসলাম ২৮ জুন সংসদে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি বরাদ্দ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
ফাউন্ডেশনের সিইও আজকের পত্রিকাকে বলেন, ফাউন্ডেশন সচল রাখার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবছর অন্তত ১০ কোটি টাকার পরিচালন ব্যয়ের স্থায়ী বরাদ্দ প্রয়োজন। একই সঙ্গে গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ, ডিজিটাল আর্কাইভ এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কার্যক্রমের জন্য পৃথক অর্থায়নও দরকার। বিজয়নগরে সরকারের দেওয়া জমিতে স্থায়ী ভবন নির্মিত হলে এবং নিয়মিত সরকারি বরাদ্দ নিশ্চিত করা গেলে ফাউন্ডেশন দীর্ঘ মেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরে পাবে।