হোম > বিশেষ সংখ্যা

তিস্তায় চাই ন্যায্য হিস্যা, চাই দেশীয় ব্যবস্থাপনা

তুহিন ওয়াদুদ

তিস্তা নদী বাংলাদেশ-ভারত দুটি দেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত। অন্যায়ভাবে ভারতের পানি প্রত্যাহার করায় এবং পরিচর্যার অভাবে খরা-বর্ষা উভয় সময়ে তীরবর্তী মানুষের অভিশাপে পরিণত হয়েছে নদীটি। অথচ এটি ছিল উত্তরের জীবনরেখা। একে মরণদশা থেকে জীবনরেখায় উত্তরণের কোনো বিকল্প নেই।

নদীর ব্যবস্থাপনা যেহেতু অববাহিকাভিত্তিক হতে হয়, তাই বাংলাদেশ-ভারত উভয় দেশ মিলে এই নদী ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা উচিত। এটাই উত্তম পন্থা হলেও সেই সুযোগ ভারত রাখেনি। কারণ, তিস্তা নদী থেকে ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহার করে। বাধ্য হয়ে বাংলাদেশকে নিজ দেশীয় ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। এটাই স্বাভাবিক।

তিস্তা নদীর সুরক্ষার জন্য যত আন্দোলন হয়েছে, বাংলাদেশে আর কোনো নদী নিয়ে এত আন্দোলন হয়নি। শুধু নদী ইস্যুতে নয়, দেশে আর কোনো স্থানীয় সংকট উত্তরণে দেশে এত বড় আন্দোলনের ইতিহাস আছে কি না সন্দেহ। তিস্তা নদীর চেয়ে ক্ষিপ্র প্রবাহের এবং এর চেয়ে অধিকতর ভাঙনপ্রবণ নদীরও ভাঙন বন্ধ হয়েছে। কিন্তু তিস্তার সংকট দূরীকরণ বিষয়টি অতীতের সরকারগুলো সব সময় অবহেলার চোখে দেখেছে।

তিস্তা নদীর প্রধানত সংকট দুটি। প্রথমত ভাঙন এবং দ্বিতীয়ত নদীর প্রবাহপথ উন্মুক্ত রাখা। ‘উন্মুক্ত রাখা’ কথার অর্থ হচ্ছে গভীরতা ঠিক রাখা এবং উজান থেকে আসা প্রচুর পলি জমে নদীর তলদেশ যেন ভরাট হয়ে না যায়, সেই ব্যবস্থা নেওয়া। এই সামান্য দুটি কাজ যে বাংলাদেশে সরকার কেন করেনি, সেটাই বিস্ময়কর। এই কাজ করতে যে অনেক টাকার প্রয়োজন, বিষয়টি তেমনও নয়।

সরকার রংপুর অঞ্চলে কোনো উন্নয়নমূলক কাজ করে না বললেই চলে। ৫ থেকে ৭ বছরে ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা রংপুরের জন্য বরাদ্দ দেওয়ার কথা সরকার ভাবতেও পারে না। রংপুরও যে বাংলাদেশে, রংপুরের উন্নয়নও যে বাংলাদেশের উন্নয়ন, রংপুরের দুই কোটি মানুষের কষ্ট যে বাংলাদেশের ‘দুই কোটি’ মানুষের কষ্ট, এটি অতীতের সরকারগুলো বোঝার মতো সক্ষম ছিল না। একদিকে ভারতের পানি শোষণনীতিতে মরছে তিস্তা, অন্যদিকে বৈষম্যপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে সরকারও তিস্তাকে ভয়ংকর হিসেবে গড়ে তোলারই কাজ করছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য শুধু ঘোষণাই দেয়নি, তারা প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য কিছু কিছু কাজ শুরু করেছে। কাজ মাঠপর্যায়ে শুরু না হওয়া পর্যন্ত তিস্তাপারের মানুষ পূর্ণ ভরসা পাচ্ছে না।

তিস্তা নদীর সংকটকে অতীতে অকারণে ভূরাজনৈতিক ফাঁদে ফেলা হয়েছে। বিগত সরকারগুলোর যদি তিস্তা নিয়ে কাজ করার সদিচ্ছা থাকত, তাহলে চীনের কাছে এই ঋণ গ্রহণের জন্য মুখাপেক্ষী হতো না। তিন লাখ কোটি টাকা ব্যয়ে সারা দেশে যখন বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প চলমান ছিল, তখন বছরে মাত্র এক-দেড় হাজার কোটি টাকা তিস্তার জন্য বরাদ্দ রাখা কোনো কঠিন কিছু ছিল না। ২০১৬ সালে মাত্র সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা ব্যয় করলে ভাঙনরোধ, খননসহ আরও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করা যেত। সরকার যদি শুধু ভাঙনরোধ এবং খনন ও পানির প্রবাহ সহজীকরণের কাজ করত, তাহলে এর চেয়ে অনেক কম টাকায় সে কাজ হতো। এখনো যদি ভাঙনরোধ এবং নদীর প্রবাহ সচল করার কাজ করা যায়, তাতেও ১০ হাজার কোটি টাকা লাগবে না। কারিগরি সহায়তার জন্য সরকার প্রয়োজন মনে করলে উন্নত প্রযুক্তি যাদের আছে, সেই সব দেশের কাছে সেই সহায়তা নিলেই পারত। সেটি হতে পারে চীন কিংবা বিশ্বের যেকোনো উপযুক্ত দেশ।

তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে কচলাতে কচলাতে তিতায় পরিণত করা হয়েছে। অতীতে দেখেছি, চীনের কাছে ঋণ নেওয়ার নামে, কখনো ভারত কাজ করবে—এই প্রতিশ্রুতিতে আটকে ছিল তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে গেলে তিস্তা নদীসহ অন্যান্য নদীর ব্যবস্থাপনার ওপরে কাজ করার আশ্বাস দিয়েছে চীন।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য এখনো বিস্তারিত সমীক্ষা হয়নি। এটি খুব দুঃখজনক। যে সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে কথাবার্তা চলছে, তা উপরিতলের। সরকারের উচিত হবে নিজস্ব অর্থায়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ করা।

তিস্তা নদী বাংলাদেশের একক কোনো সম্পদ নয়। এই নদী পৃথিবীর সম্পদ। প্রথমত বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ হলেও নদীটি এই অঞ্চলের ভারসাম্য রক্ষায় এক অনন্য প্রবাহ। এই নদীতে অতীতে যত জলজ উদ্ভিদ আর প্রাণবৈচিত্র্য ছিল, সেগুলো কমছে। সারা বছর পানি আর ঠিকমতো থাকে না। ফলে এই অঞ্চলের ভূমি, কৃষি, জীববৈচিত্র্য—সবকিছুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তিস্তার অশুভ পরিণতি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, পৃথিবীর জন্যই ক্ষতিকর। বিশ্বব্যাপী সৃষ্ট জলবায়ুর অভিঘাত বৃদ্ধিতে তিস্তার পানিশূন্যতার যৎসামান্য হলেও প্রভাব আছে। বাংলাদেশের সঙ্গে অপরাপর অনেক দেশের উচিত ভারতের পানি আগ্রাসী ভূমিকার বিরুদ্ধে কথা বলা।

বাংলাদেশ সরকারের প্রধানতম কাজ তিস্তা নদীতে এমন একটি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা, যাতে নদীটি বাঁচে, নদীপারের কৃষি বাঁচে, নদীভিত্তিক সমস্ত প্রাণবৈচিত্র্য বাঁচে। নিজ দেশীয় ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী ভারতের পানি আগ্রাসী ভূমিকার বিরুদ্ধেও কথা বলতে হবে। ন্যায্য হিস্যার ভিত্তিতে তিস্তা নদীর পানি পাওয়া বাংলাদেশের অধিকার। আমরা তিস্তার ন্যায্য হিস্যাও চাই, নদী সুরক্ষায় দেশীয় ব্যবস্থাপনাও চাই।

লেখক: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক হতে হবে বহুমাত্রিক

আধো ঘুম আধো স্বপ্নের মানুষের জন্য প্রত্যাশা

সৌরবিদ্যুৎ: ১০ হাজারের মাইলফলক ছুঁতে হলে

জ্বালানিসংকটের কারণ এবং আশু করণীয়

তারেক রহমান ও আশা-নিরাশার টানাপোড়েন

ভাষা আর ভাষার কবিতা

রহস্যময় ইউস্কারা ভাষার টিকে থাকার লড়াই

একমাত্র নয়, তবে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস আছে বাংলা ভাষার

গ্রাহক অভিজ্ঞতা ও সন্তুষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার

নিরাপত্তা ও সেবায় মার্কেট শেয়ারে এগিয়ে সিটি ব্যাংক