হোম > বিশেষ সংখ্যা

সৌরবিদ্যুৎ: ১০ হাজারের মাইলফলক ছুঁতে হলে

শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী

গ্রাফিক্স: আজকের পত্রিকা

রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়নের দিক থেকে দেখলে বাংলাদেশ আজ দৃশ্যত এক গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত নতুন নির্বাচিত সরকার গত এপ্রিলে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, সময়োপযোগী এবং প্রয়োজনীয় একটি সিদ্ধান্ত। তবে বাস্তবতা হলো, এটি অর্জনের জন্য সময় খুব সীমিত। হাতে পাঁচ বছরের কম সময়। তাই প্রশ্নটি ‘বাংলাদেশ কি নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাবে’ নয়; বরং ‘এই সীমিত সময়ের মধ্যে কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে রূপান্তর ঘটাতে পারবে’—এটাই মূল চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির যাত্রা দীর্ঘদিন ধরে এক অসমাপ্ত সম্ভাবনার গল্প। ২০০৮ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে ২০১৫ সালের মধ্যে ৫ শতাংশ এবং ২০২০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু দুটি লক্ষ্যের কোনোটি অর্জিত হয়নি। এত দিন পর বর্তমানে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ৫ শতাংশের কিছু বেশি, যার সিংহভাগই সৌরবিদ্যুৎ। এটি দেখায় যে সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়ন সক্ষমতা এখনো দুর্বল।

বিশ্ব পরিস্থিতি কিন্তু এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। সৌরবিদ্যুৎ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎস। প্রযুক্তির উন্নয়ন, উৎপাদন খরচ হ্রাস এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী হওয়ার ফলে সৌরবিদ্যুৎ এখন দ্রুত সম্প্রসারণযোগ্য একটি সমাধান। বাংলাদেশ যদি সঠিক নীতি ও বাস্তবায়ন কাঠামো তৈরি করতে পারে, তবে এই পরিবর্তন দেশটির জন্য এক বড় সুযোগে পরিণত হবে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের জন্য অনুকূল। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪ দশমিক ৫ কিলোওয়াট-ঘণ্টা/বর্গমিটার সৌর বিকিরণ পাওয়া যায়, যা সৌরপ্রকল্পের জন্য যথেষ্ট। মূল সমস্যা হলো কাজের গতি ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা। অতীতের ধীর অগ্রগতির কারণে এখন ১০ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য আগামী কয়েক বছরে কয়েক গিগাওয়াট ক্ষমতা যুক্ত করতে হবে, যা হবে আমাদের জন্য অভূতপূর্ব দ্রুত সম্প্রসারণ।

সৌরবিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় বাধা প্রযুক্তি নয়, বরং নীতিগত সমর্থন ও বিনিয়োগ আস্থার ঘাটতি। নিকট অতীতে নীতিগত পরিবর্তন এবং প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনাস্থা ও ঝুঁকির আশঙ্কা বাড়িয়েছে। অনেক দরপত্রে একক বিডারের অংশগ্রহণ এমনকি কোনো বিড না আসার ঘটনাও দেখা গেছে, যা মূলত নীতিগত দুর্বলতার প্রতিফলন।

বিশেষ করে প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে পেমেন্ট গ্যারান্টি-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে। এর সমাধান হতে পারে স্ট্যান্ডার্ডাইজড ও ব্যাংকেবল বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ), যা দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা দেবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনবে।

মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি (এমপিপি) একটি সম্ভাবনাময় কাঠামো হলেও এর কার্যকারিতা নির্ভর করছে হুইলিং চার্জ বা বিদ্যুৎ পরিবহন চার্জ যৌক্তিকভাবে নির্ধারণের ওপর। এটি ভারসাম্যপূর্ণ না হলে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে, আবার অত্যধিক কম হলে এটি গ্রিডে পরিবর্তনশীল বিদ্যুৎ প্রবেশের কারণে বিদ্যুৎ সঞ্চালন এবং বিতরণ সংস্থাগুলোর ওপর গ্রিড স্থিতিশীল রাখার সহায়ক বা পরিপূরক সেবা নিশ্চিত করতে চাপ সৃষ্টি করবে, যেখানে এমপিপি অফটেকার স্থিতিশীল বিদ্যুৎ গ্রহণ করবে।

বাংলাদেশে জমির অভাবকে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের প্রধান বাধা হিসেবে দেখা হলেও এটি সৃজনশীল পরিকল্পনার মাধ্যমে সমাধানযোগ্য। চরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা, অব্যবহৃত সরকারি জমি এবং কৃষি-অযোগ্য ভূমি সৌর প্রকল্পের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।

এ ছাড়া মহাসড়ক, রেললাইন এবং শিল্পাঞ্চলের আশপাশের জমি ব্যবহার করে সোলার করিডর তৈরি করা সম্ভব। সরকার ইতিমধ্যে কিছু অব্যবহৃত রাষ্ট্রীয় জমি বেসরকারি খাতে ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে, তবে এর জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ লিজ-নীতি, দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের নির্বিঘ্ন ইভাকুয়েশন সুবিধা নিশ্চিত করা।

ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা। কাপ্তাই লেকসহ দেশের বিভিন্ন বড় জলাশয়ে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এটি স্থলের জমির ওপর চাপ কমায় এবং একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করে। তবে পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় রেখে সব প্রকল্পের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন এবং সঠিক নকশা নিশ্চিত করা জরুরি। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে ভাসমান সৌর প্রকল্প সফলভাবেই পরিচালনা করা সম্ভব।

সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক সংযুক্তির জন্য বিদ্যুৎ গ্রিড ব্যবস্থার আধুনিকায়ন অপরিহার্য। বর্তমানে বাংলাদেশের গ্রিড অবকাঠামো উচ্চমাত্রার পরিবর্তনশীল নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ গ্রহণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।

স্মার্ট গ্রিড, সঞ্চালন লাইনের আধুনিকায়ন, আধুনিক ডিসপ্যাচ সিস্টেম এবং ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ ছাড়া বড় পরিসরের সৌরবিদ্যুৎ কার্যকরভাবে সংযুক্ত করা সম্ভব নয়। এসব সুবিধা না থাকলে নতুন উৎপাদন ক্ষমতা বাস্তবে গ্রিডে অকার্যকর থেকে যেতে পারে।

দেশের সৌরবিদ্যুৎ খাতে অন্যতম বড় সংকট দক্ষ মানবসম্পদের অভাব। ইউটিলিটি-স্কেল সৌর প্রকল্পে বিপুলসংখ্যক প্রকৌশলী, টেকনিশিয়ান, প্রকল্প ব্যবস্থাপক এবং গ্রিড বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন হয়। বিশ্বব্যাপী অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, প্রতি মেগাওয়াট সৌর প্রকল্পে গড়ে ২০-২৫ জনের শ্রম প্রয়োজন হয়। সেই হিসাবে ১০ হাজার মেগাওয়াট লক্ষ্য অর্জনে ২ থেকে আড়াই লাখ কর্মীর প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে কয়েক হাজার হবে উচ্চ দক্ষ প্রকৌশলী। স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে, সৌর তথা নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ কর্মসংস্থানের বড় উৎস।

প্রশিক্ষিত জনশক্তির ঘাটতি পূরণে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত মানবসম্পদ কৌশল গ্রহণ প্রয়োজন। দ্রুত কারিকুলাম সংস্কার করে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যসূচিতে সৌরপ্রযুক্তি, ব্যাটারি স্টোরেজ এবং গ্রিড ইন্টিগ্রেশন অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দিয়ে ২০২৯ সালের মধ্যে অন্তত ৫০ হাজার টেকনিশিয়ানকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ বাস্তবায়নে প্রায় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। এটি বড় অঙ্ক হলেও অর্জনযোগ্য।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ফাইন্যান্স উইন্ডো, ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স মডেল, আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য নীতি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। মূলধনের খরচ কমানো গেলে প্রকল্পের আর্থিক উপযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

ছাদভিত্তিক (রুফটপ) সৌরশক্তি প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য সমাধান। শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে এটি ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব। এটি নতুন জমির প্রয়োজন ছাড়াই দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে পারে। তবে নেট মিটারিং নীতি জটিলতা, দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ এই খাতকে বাধাগ্রস্ত করছে। এগুলো দ্রুত সংস্কার করা জরুরি। বড় বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের জন্য একটা বড় অংশ রুফটপ সৌরশক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

ভিয়েতনাম, ভারত, পাকিস্তান ও অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা দেখায় যে পরিষ্কার নীতি, দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি এবং ফিড-ইন ট্যারিফ সৌরবিদ্যুৎ দ্রুত সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশকে একইভাবে নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।

দেশের দক্ষিণাঞ্চল সৌরবিদ্যুতের জন্য ও উপকূলীয় অঞ্চল বায়ুবিদ্যুতের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হলেও দুর্বল ট্রান্সমিশন অবকাঠামোর কারণে অনেক প্রকল্প কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এই অঞ্চলে গ্রিড উন্নয়ন জরুরি, নইলে ভবিষ্যতে অনেক প্রকল্প ‘অকার্যকর সম্পদের’ পরিণত হবে।

সব মিলিয়ে তাই বলা যায়, ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব নয়, তবে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটবে না। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত নীতি, শক্তিশালী বিনিয়োগ কাঠামো, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ এবং দ্রুত বাস্তবায়ন সক্ষমতা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি শুধু জ্বালানি প্রকল্প নয়; বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, শিল্প প্রতিযোগিতা এবং জলবায়ু অভিযোজনের একটি কৌশলগত রূপান্তর। তেল, গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ক্রমেই ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। অন্যদিকে সৌরবিদ্যুৎ সীমাহীন, দেশীয়ভাবে প্রাপ্য এবং ক্রমাগতভাবে সাশ্রয়ী।

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ, আগামী কয়েক বছরের নীতিগত ও বাস্তবায়নগত পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে—বাংলাদেশ কি নবায়নযোগ্য জ্বালানির নেতৃত্ব দেবে, নাকি ব্যয়বহুল, অনিশ্চিত আমদানিনির্ভর জ্বালানির চক্রে আটকে থাকবে।

লেখক: পরিচালক, সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

ইমেইল: shahriar.ac @gmail.com

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক হতে হবে বহুমাত্রিক

তিস্তায় চাই ন্যায্য হিস্যা, চাই দেশীয় ব্যবস্থাপনা

আধো ঘুম আধো স্বপ্নের মানুষের জন্য প্রত্যাশা

জ্বালানিসংকটের কারণ এবং আশু করণীয়

তারেক রহমান ও আশা-নিরাশার টানাপোড়েন

ভাষা আর ভাষার কবিতা

রহস্যময় ইউস্কারা ভাষার টিকে থাকার লড়াই

একমাত্র নয়, তবে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস আছে বাংলা ভাষার

গ্রাহক অভিজ্ঞতা ও সন্তুষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার

নিরাপত্তা ও সেবায় মার্কেট শেয়ারে এগিয়ে সিটি ব্যাংক