হোম > বিশেষ সংখ্যা

পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্বামীকে হাঁটতে শিখিয়েছিলেন, জুলাইয়ে তাঁকেই হারান নিহা

অর্চি হক, ঢাকা 

মো. নাদিম ও নিহা। ছবি: সংগৃহীত

‘ডিসেম্বরে শাশুড়ি, জানুয়ারিতে শ্বশুর, আর জুলাইয়ে নাদিম। এই সময়ের মধ্যে আমার সন্তানেরা তাদের দাদা-দাদি আর বাবাকে হারিয়েছে’। ছলছল চোখে এভাবেই স্বামীর মৃত্যুর কথা আমাদের জানালেন নিহা। সঙ্গে তিনি এ-ও জানালেন, নাদিমের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীর সকালে বড় ছেলে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘মা, আজ কি বাবা মারা গেছে?’ তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ বলতেই ও আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। পরে কবরস্থানে গিয়ে বাবার জন্য দোয়া করে।’ দুই বছর পর সন্তানেরা বাবার অনুপস্থিতি বুঝতে শিখেছে। বড় ছেলে এখন মিরপুরে একটি মাদ্রাসায় পড়ে।

জুলাই আন্দোলনে গিয়ে স্বামী মো. নাদিম শহীদ হয়েছেন। এই কষ্ট যতটা না যাতনার, তার চেয়ে যাতনাময় হলো, একজন অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করে তোলার পর আবার তাঁকে হারিয়ে ফেলা। হ্যাঁ, ২০২২ সালে স্ট্রোকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন নাদিম। অক্লান্ত পরিশ্রম করে তাঁকে হাঁটতে শিখিয়েছিলেন নিহা। সেই নাদিমই জুলাই আন্দোলনে গুলিতে শহীদ হন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই।

স্বামীর মৃত্যু, পাঁচ বছরের কম বয়সী দুই সন্তানের দায়িত্ব, শ্বশুর-শাশুড়ির পরপর মারা যাওয়া—সব মিলিয়ে তাবাসসুম আক্তার নিহা অকূলপাথারে। সে কথাই তিনি শোনাতে বসেছিলেন আমাদের। নিহা বললেন, ‘জুলাই-আগস্ট এলেই মনে হয়, আমাদের জীবনের সবচেয়ে কষ্টের সময়টা আবার ফিরে এসেছে। এই মাসটাই আমার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। যে মানুষটা ছিল আমার জীবনের সবকিছু, সেই মানুষটাকেই ১৯ জুলাই আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হলো।’

২০১৮ সালে বিয়ের সময় নিহা নবম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। নিহা যখন তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা, সেই সময় ২০২২ সালে নাদিম অসুস্থ হয়ে পড়েন। সে সময় বড় ছেলের বয়স মাত্র ছয় মাস। সেই অবস্থাতেই এক মাস হাসপাতালে থেকে স্বামীর দেখাশোনা করেছেন তিনি।

সেই দুঃসহ দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করে নিহা বলেন, ‘সবাই বলেছিল, নাদিম আর কোনো দিন হাঁটতে পারবে না। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি ওকে আবার হাঁটতে শিখিয়েছিলাম। ধীরে ধীরে সবকিছু স্বাভাবিক হচ্ছিল। মনে হয়েছিল, জীবনের সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধটায় বুঝি আমি জিতে গেছি। কিন্তু সেই যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই শুরু হলো আরেক যুদ্ধ।’

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রামপুরা-বনশ্রী এলাকায় ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন নাদিম। বিষয়টি তিনি স্ত্রীকে জানাননি। পরদিন ১৯ জুলাই শুক্রবারের সকালটিই ছিল তাঁদের একসঙ্গে কাটানো শেষ সকাল।

বনশ্রী এলাকায় গ্যাসের চুলা ও সিলিন্ডারের দোকান ছিল নাদিমের। প্রতিদিনের মতো সেদিন ভোরেও গোসল করে নাশতা করেন। এরপর দোকানে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হন তিনি। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে স্ত্রীর কাছে এক কাপ চা পান করতে চান। কিন্তু বাসায় গ্যাস না থাকায় চা আর পান করা হয়নি নাদিমের। জুমার নামাজের আগে কোন পাঞ্জাবি পরবেন, তা নিয়েও কথা হয় নিহার সঙ্গে।

জুমার নামাজের পর দুই সন্তানকে নিয়ে মায়ের কাছে যান নিহা। সেখানে বাইরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দৌড়াদৌড়ি এবং চিৎকার শুনে নিচে নেমে আসেন তিনি। কিছুক্ষণ পর পুলিশ ধাওয়া দিলে সবাই দৌড়াতে থাকে দিগ্‌বিদিক। নাদিমকে খুঁজে ফিরছিল নিহার চঞ্চল চোখ, কিন্তু তাঁর দেখা আর পাননি। ‘আমি শুধু জিজ্ঞেস করছিলাম, নাদিম কোথায়? নাদিম কোথায়?’ উত্তর পেতে খুব বেশি সময় লাগেনি নিহার।

পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, রামপুরা থানাসংলগ্ন একটি সড়কের কাছে গুলিবিদ্ধ হন নাদিম। গুলি তাঁর পেটে লেগে পিঠ ভেদ করে বেরিয়ে যায়। বেলা আড়াইটা থেকে তিনটার দিকে রক্তাক্ত অবস্থায় নাদিমকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়।

‘ও তখনো বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। হয়তো কিছু বলতে চেয়েছিল। কিন্তু বলতে পারেনি,’—কথা জড়িয়ে আসে নিহার।

চিকিৎসক নাদিমকে মৃত ঘোষণা করার পরও শেষ হয়নি পরিবারের দুর্ভোগ। বনশ্রী থেকে মরদেহ মিরপুরে নাদিমের পৈতৃক বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সময় বিভিন্ন জায়গায় পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হয় তাঁদের। নিহা বলেন, ‘পথে কয়েকবার আমাদের গাড়ি থামানো হয়েছিল। আমি বলেছিলাম, মানুষটা তো মারা গেছে। এখন অন্তত ওকে বাসায় নিয়ে যেতে দেন।’

‘আমার বড় ছেলেকে জানাজার প্রথম কাতারে দাঁড় করানো হয়েছিল। বাবার জানাজা পড়ে ও আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। আমার ছেলে বাবাকে কাঁধে নিতে পারেনি, একমুঠো মাটিও দিতে পারেনি।’—নিহা জানিয়েছেন আমাদের।

কী চান নিহা? তাঁর সরল উত্তর, জুলাইয়ের প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার এবং শহীদ পরিবারের নিরাপত্তা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা। দৃঢ়কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিচার হোক।’

রক্তভেজা পথে যেভাবে এল বিজয়

আর্থিক সংকটে হিমশিম জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন

নেপথ্যের গল্প: ‘সাগর ইজারা দিয়েছেন এমপি’

পরীক্ষার ফল প্রকাশ: ছোট ছোট পরিবর্তনে বড় বদল আসুক

পাহাড়িয়ারা এখন বাড়িতেই আছেন

দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে স্বাবলম্বী করতে হবে: আমিনুল হক

রাতে রাতে ভরে উঠছে শীতলক্ষ্যার পেট

একদিন মানুষ আমাদের দেশ দেখতে আসবে

প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে আমাদের যা করতে হবে

সংবাদপত্র এগিয়ে যেতে পারে যেভাবে