পারিবারিক কলহ ও দাম্পত্য টানাপোড়েনে একসময় সংসার ছেড়ে মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসতে হয়েছিল মর্জিনা খাতুনকে। শূন্যহাতে ফিরে এলেও থেমে থাকেননি তিনি। ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার খেরবাড়ী গ্রামে বাবার ভিটায় নতুন করে জীবন শুরু করেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকলেও জীবিকার তাগিদে বর্গা জমিতে কৃষিকাজ ও পশুপালন শুরু করেন। সেই সংগ্রামের পথ পেরিয়ে মর্জিনা এখন নিজের গ্রামে বাল্যবিবাহ, যৌতুক ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কাজ করে স্থানীয়দের আস্থার জায়গা তৈরি করেছেন।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘মানবকল্যাণ পরিষদ’ (এমকেপি) ও ‘নেটজ বাংলাদেশ’-এর কারিগরি সহায়তায় মর্জিনার নেতৃত্বে খেরবাড়ী গ্রামে ২৫ সদস্যের একটি নাগরিক সমাজ সংগঠন (সিএসও) গড়ে ওঠে। এরপর থেকে তাঁর বাড়ির উঠানে নিয়মিত সচেতনতামূলক বৈঠক, আলোচনা ও প্রচারের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ, নারী নির্যাতন, যৌতুক ও সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কাজ করে আসছেন সংগঠনের সদস্যরা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় খেরবাড়ী এলাকায় বাল্যবিবাহের প্রবণতা ছিল বেশি। বিশেষ করে দরিদ্র ও পিছিয়ে থাকা পরিবারগুলোর মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটত। মর্জিনা ও তাঁর সংগঠনের সদস্যরা পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে উৎসাহিত করছেন।
এই সংগঠনের সদস্য শম্পা আক্তার নিজেও বাল্যবিবাহের শিকার। তিনি বলেন, ‘নবম শ্রেণিতে ওঠার আগেই আমার বিয়ে হয়েছিল। অল্প বয়সে বিয়ের শারীরিক ধকল আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।’
স্থানীয় কৃষক সোহেল রানা বলেন, ‘আগে এলাকায় বাল্যবিবাহের প্রবণতা বেশি ছিল। মর্জিনা খাতুনের সামাজিক তৎপরতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের কারণে বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা এখন অনেকটাই কমেছে।’
গেদুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘মর্জিনার হাত ধরেই আজ খেরবাড়ী গ্রাম মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে। বেগম রোকেয়ার পথ অনুসরণ করে তিনি এ এলাকায় একটি ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তন আনছেন।’
নিজের সংগ্রামের কথা তুলে ধরে মর্জিনা খাতুন বলেন, ‘সহযোগী সংগঠনগুলোর সহায়তায় আজ আমরা খেরবাড়ী গ্রামে নারীর ক্ষমতায়ন, মানবাধিকার রক্ষা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারছি।’
ব্যক্তিজীবনের প্রতিকূলতা পেরিয়ে মর্জিনা এখন নিজের মেয়েকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার পাশাপাশি গ্রামের অন্য মেয়েদেরও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে কাজ করছেন। তাঁর লক্ষ্য, সামাজিক কুসংস্কার ও বৈষম্য দূর করে নারীদের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা।
একসময় যে নারী নিজের জীবনসংগ্রাম সামলাতেই ব্যস্ত ছিলেন, সেই মর্জিনাই এখন সীমান্তের খেরবাড়ী গ্রামের মানুষের সচেতনতা ও সামাজিক পরিবর্তনের অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছেন।