কর্মস্থলের গেটে বাইরে থেকে তালা, ভেতরে পড়ে আছে নিরাপত্তাপ্রহরীর মরদেহ। দুপুরে বাবার জন্য খাবার নিয়ে কর্মস্থলে গিয়ে গেটে তালা দেখে ফিরে গিয়েছিলেন ছেলে। সন্ধ্যায় দায়িত্ব নিতে এসে একই অবস্থা দেখে সন্দেহ হয় আরেক নিরাপত্তাপ্রহরীর। পরে দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে তিনি দেখতে পান, নিরাপত্তাপ্রহরী আব্দুর রহমান (৫৮) মাটিতে নিথর পড়ে আছেন।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নে ঠাকুরগাঁও-দিনাজপুর মহাসড়কের পাশে হানিফ পেট্রল পাম্পসংলগ্ন নিটল-টাটা সার্ভিসিং সেন্টারে গতকাল মঙ্গলবার এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির সাবেক নিরাপত্তাপ্রহরী জুয়েলকে (১৯) আটক করেছে পুলিশ। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিহত আব্দুর রহমানের ব্যবহৃত বাইসাইকেল ও মুঠোফোন উদ্ধার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি লাঠিও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
আজ বুধবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ঠাকুরগাঁও পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খোদাদাদ হোসেন।
পুলিশ ও নিহতের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বাসা থেকে কর্মস্থলের উদ্দেশে বের হন আব্দুর রহমান। সেখানে পৌঁছে রাতের পালার নিরাপত্তাপ্রহরী তোয়াবুর রহমানের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেন তিনি। বেলা ১১টার দিকে স্ত্রীর সঙ্গে মুঠোফোনে সর্বশেষ কথা বলেন আব্দুর রহমান। এরপর পরিবারের সদস্যরা একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাঁর ফোন বন্ধ পান।
বেলা পৌনে ২টার দিকে আব্দুর রহমানের ছেলে বাবার জন্য খাবার নিয়ে কর্মস্থলে যান। বাইরে থেকে গেটে তালা ঝুলতে দেখে তিনি ফিরে আসেন।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রাতের পালায় দায়িত্ব নিতে সেখানে যান তোয়াবুর রহমান। তিনিও গেটে তালা দেখতে পান। একই সময় আব্দুর রহমানের ছেলে সেখানে আবার এলে দুজনের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়। পরে তোয়াবুর দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে আব্দুর রহমানকে পড়ে থাকতে দেখেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঘটনার পর নিহতের পরিবারের সদস্য, প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে একই প্রতিষ্ঠানের সাবেক নিরাপত্তাপ্রহরী জুয়েলকে শনাক্ত করা হয়। পরে জুয়েলকে আটকের জন্য ঠাকুরগাঁও শহরের সেনুয়াপাড়া এলাকায় অভিযান চালানো হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে যান। পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তাঁর অবস্থান শনাক্ত করে গোয়ালপাড়ায় নানার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাঁকে আটক করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে জুয়েল হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আব্দুর রহমানের মুঠোফোন ও বাইসাইকেল উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি লাঠিও উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জুয়েল জানিয়েছেন, তিনি আগে ওই প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাপ্রহরী হিসেবে কাজ করতেন। কর্মরত অবস্থায় প্রতিষ্ঠানের একটি জানালার কাচ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেটি মেরামতের জন্য তাঁর বেতনের টাকা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ আব্দুর রহমানের কাছে দিয়েছিল। জানালার কাচটি মেরামত করার পর ওই টাকা দিয়ে আরও কিছু কাজ করাতে চেয়েছিলেন আব্দুর রহমান। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। জুয়েলের ধারণা হয়, আব্দুর রহমান নিজ উদ্যোগে ওই কাজ করাচ্ছেন। এ নিয়ে তাঁর ক্ষোভ তৈরি হয়।
পুলিশ জানায়, ওই ক্ষোভের জের ধরে ঘটনার দিন জুয়েল বাউন্ডারির দেয়াল টপকে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ঢোকেন। পরে আব্দুর রহমানের অজান্তে লাঠি দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করেন। এতে গুরুতর আহত হয়ে আব্দুর রহমানের মৃত্যু হয় বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন জুয়েল।
তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, এতে অন্য কেউ জড়িত কি না এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খোদাদাদ হোসেন বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ কাজ করছে। আটক আসামির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।