টাঙ্গাইলের সখীপুরে লন্ডনপ্রবাসী চিকিৎসক ডা. শাহ জালালের বিরুদ্ধে জোর করে জমি লিখে নিয়ে বৃদ্ধ বাবা-মাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ করেছেন তাঁর মা আনোয়ারা বেগম। তবে ডা. শাহ জালাল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, পারিবারিক সম্পত্তি রক্ষায় মা-বাবার সম্মতিতে ইসলামী ফারায়েজ অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টন করা হয়েছে। এ নিয়ে দলিল বাতিলের মামলা আদালতে বিচারাধীন।
অভিযোগটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। আজকের পত্রিকার অনুসন্ধানে আনোয়ারা বেগম, ডা. শাহ জালাল, সাব-রেজিস্ট্রার, ভবনের ভাড়াটিয়া ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে পারিবারিক সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে।
ডা. শাহ জালালের বাবা আব্দুর রহমান মিয়া সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ছিলেন। মির্জাপুর উপজেলার আজগানা ইউনিয়নের কড়িপাড়ার বদরচালা এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহমান চাকরিজীবনে ১৯৮৮ সালের দিকে সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে ২৪ শতাংশ জমি কেনেন। সেখানে তিনতলা ভবন নির্মাণ করে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। মির্জাপুরের গ্রামের বাড়িতেও তাঁর ২০০ শতাংশ জমি রয়েছে।
আব্দুর রহমানের বড় মেয়ে রোকসানা পারভীন লিপি স্বামীর সঙ্গে কানাডাপ্রবাসী। ছোট মেয়ে সুরাইয়া জেবিন রিনা স্বামীকে নিয়ে বাবার বাসায় থেকে মা ও অসুস্থ বাবার দেখাশোনা করেন। সবার ছোট ডা. শাহ জালাল স্ত্রী-সন্তান নিয়ে লন্ডনের দ্য রয়্যাল মার্সডেন ফাউন্ডেশন ট্রাস্টে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত।
কয়েক বছর আগে আব্দুর রহমান ডিমেনশিয়া ও কিডনিজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হন। ডা. শাহ জালালের দাবি, তাঁর বাবা কানাডাপ্রবাসী বড় মেয়ে রোকসানা পারভীন লিপির স্বামীর হুমকির মুখে মির্জাপুরের ২০০ শতাংশ জমির মধ্যে ১০৭ শতাংশ জমি লিখে দেন।
ডা. শাহ জালাল সম্প্রতি দেশে এসে বাবা-মায়ের সম্মতিতে সখীপুরের সম্পত্তি ইসলামী ফারায়েজ অনুযায়ী ভাগ করেন বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাসায় থাকা ছোট বোনের নামে এক অংশ, মায়ের দুই আনা অংশ মায়ের নামে এবং অবশিষ্ট অংশ তাঁর নামে হেবা দলিল করা হয়।
দলিল সম্পাদনের কিছুদিন পর ডা. শাহ জালাল লন্ডনে ফিরে যান। পরে আনোয়ারা বেগম স্বামীসহ সখীপুরের বাড়ি ছেড়ে মির্জাপুরে চলে যান। সাংবাদিকদের কাছে তিনি অভিযোগ করেন, ছেলে ও ছোট মেয়ের জামাই তাঁকে এবং তাঁর স্বামীকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। আনোয়ারা বেগম দলিল বাতিল চেয়ে আদালতে মামলা করেন এবং মারধরের অভিযোগে ডিবি কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দেন।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে ‘জোর করে জমি লিখে নিয়ে মা-বাবাকে বাসা থেকে তাড়িয়ে দিলেন ডা. ছেলে ও মেয়ের জামাই’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর ফেসবুক লাইভে ডা. শাহ জালাল বলেন, পারিবারিক বিরোধের মূল কারিগর তাঁর বড় বোনের স্বামী শাহ আলম, যিনি ‘ডেসটিনি শাহ আলম’ নামে পরিচিত। ডা. শাহ জালালের দাবি, ডেসটিনি কোম্পানির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২২ সালে হাইকোর্টের দেওয়া ১২ বছরের কারাদণ্ডাদেশের পর শাহ আলম কানাডায় রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন।
ফেসবুক লাইভে ডা. শাহ জালাল বলেন, ‘তিনি আমার বোনকে ডিভোর্স দেওয়ার হুমকি দিয়ে আমার অসুস্থ বাবাকে চাপ দিয়ে মির্জাপুরের ১০৭ শতাংশ জমি লিখে নিয়েছেন। এর আগেও বাবার পেনশনের ৩০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।’
ডা. শাহ জালাল আরও বলেন, ‘বিষয়টি জানতে পেরে আমি দেশে যাই। মায়ের সম্মতিতেই সখীপুরের অবশিষ্ট সম্পত্তি ইসলামী ফারায়েজ অনুযায়ী সুষম বণ্টন করা হয়।’
ডা. শাহ জালালের ভাষ্য, দলিল নিবন্ধনের প্রক্রিয়া ১০ দিন ধরে চলে। এ সময় আনোয়ারা বেগম নিজে উপস্থিত থেকে খাজনা-খারিজের কাজ সম্পন্ন করেন এবং দলিলে সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেন। তিনি লন্ডনে ফেরার সময় বিমানবন্দরে বিদায় জানাতেও মা গিয়েছিলেন বলে দাবি করেন।
ডা. শাহ জালাল বলেন, ‘আমার বড় বোন আগেই ১০৭ শতাংশ জমি নিয়েছেন। সখীপুরের সম্পত্তির এক অংশ মায়ের নামেই রেজিস্ট্রি হয়েছে। আমি লন্ডন চলে আসার ১২ দিন পর মা বাসা ছাড়েন। তাহলে আমি কীভাবে তাঁদের মারধর করে বাসা থেকে বের করলাম? এখনো বাসার চাবি, ব্যক্তিগত গাড়ি, সিসিটিভি ব্যবহারের সুযোগ এবং বাসা ভাড়ার টাকা মায়ের নিয়ন্ত্রণেই আছে। তাঁরা বাসায় নিয়মিত যাতায়াত করছেন।’
আনোয়ারা বেগম মোবাইল ফোনে আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘শাহ জালাল লাইভে এসে যা বলেছে, সব মিথ্যা। এখন বিষয়টি নিয়ে পারিবারিকভাবে বসতে চাচ্ছে, দেখি কী হয়।’
মারধরের বিষয়ে আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘শাহ জালাল আমাদের মারধর করেনি। সে লন্ডন চলে যাওয়ার পর তার ছোট বোন ও বোনের জামাই আমাদের বের হয়ে যেতে চাপ দিয়েছে। শাহ জালালও লন্ডন যাওয়ার আগে আমাকে বাড়ি ছাড়তে বলে গেছে।’
আনোয়ারা বেগম আরও বলেন, ‘এখন আমি চাই, যাঁর সম্পত্তি তাঁর নামেই থাকুক। মৃত্যুর আগে এসব ভাগ হবে না। যত দিন আছি, আমরা ভোগ করব।’ বড় মেয়েকে ১০৭ শতাংশ জমি লিখে দেওয়ার কথাও তিনি স্বীকার করেন।
সখীপুরের ওই ভবনের তিনতলার ভাড়াটিয়া এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ফরিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা একই ভবনে থাকি। ওই বৃদ্ধ দম্পতির ছেলে বিদেশ থেকে আসার পর কোনো ঝগড়া বা মারধরের ঘটনা আমরা শুনিনি। বরং সবার উপস্থিতিতে জমি ও ভবন মাপজোখ করতে দেখেছি। এখন যা ঘটছে, তা বোধগম্য নয়।’
অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা টাঙ্গাইল ডিবি পুলিশের সহকারী পরিদর্শক রিয়াজ তদন্তাধীন বিষয় নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সখীপুর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার মাহমুদা আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘দলিল রেজিস্ট্রিতে জোরজবরদস্তির কোনো ঘটনা ঘটেনি। যথাযথ নিয়ম মেনেই একসঙ্গে তিনটি দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে। এর মধ্যে একটি দলিল অভিযোগকারী আনোয়ারার নামেই রেজিস্ট্রি হয়েছে। এখন যেহেতু এ বিষয়ে আদালতে মামলা হয়েছে, তাই বিষয়টি নিয়ে আদালতই সিদ্ধান্ত জানাবেন।’