দীর্ঘ ১৫ বছর প্রবাস জীবন যাপনের পর দেশে ফেরার জন্য আকুল হয়ে উঠেছিল প্রাণ। সাড়ম্বরে তাই সৌদি আরবের তায়েফ থেকে জেদ্দা বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওয়ানা দিয়েছিলেন সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার আব্দুল করিম ও তাঁর ছেলে। ফেরার টিকিট ছিল হাতে, অপেক্ষায় ছিলেন স্বজনেরা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আপনজনদের কাছে আর ফেরা হলো না তাঁদের। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর আগেই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন বাবা আব্দুল করিম। আর গুরুতর আহত হয়েছেন ছেলে। তাঁদের বাড়ি কানাইঘাট উপজেলার ৭ নম্বর দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের গাছবাড়ী এলাকার লামার তালুক গ্রামে।
তাঁদেরকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দিতে সঙ্গে যাচ্ছিলেন একই গ্রামের খালিদ। খালিদও ওই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। নিহত আরও দুজন হলেন আমিন মিয়া ও শাহ আলম। তাঁদের বাড়ি মৌলভীবাজার বলে জানা গেছে প্রাথমিকভাবে।
স্থানীয় সময় গতকাল সোমবার রাতে রিয়াদ-তায়েফ সড়কের রিদওয়ান ব্রিজের প্রায় ৭ কিলোমিটার পর আল-হাওয়িয়াহর দিকে একটি ইনোভা গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এই দুর্ঘটনার শিকার হয়। এতে ঘটনাস্থলেই চারজনের মৃত্যু ঘটে। তাঁদের মরদেহ বর্তমানে আল-মুইয়্যাহ হাসপাতালে রাখা হয়েছে।
দুই প্রবাসীর মৃত্যুর খবর কানাইঘাটে নিজ এলাকায় পৌঁছালে স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। প্রিয়জনদের বরণ করে নেওয়ার অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয় কান্নায়। এলাকায় সৃষ্টি হয় হৃদয়বিদারক পরিবেশ।
বাণীগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লোকমান উদ্দিন বলেন, ‘খবরটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। দুই প্রবাসীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর আমি তাঁদের বাড়িতে গিয়েছি। পরিবার দুটির জন্য এটি অপূরণীয় ক্ষতি।’
নিহতদের মরদেহ দেশে ফেরত আনার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্বজনেরা দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
কানাইঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল হক বলেন, ‘নিহত ৪ জনের মধ্যে ২ জন কানাইঘাট উপজেলার। অন্যদের বিষয়ে জানা যায়নি। করিম ঘটনাস্থলেই নিহত হন আর খালিদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।’
এদিকে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক। এক শোকবার্তায় তাঁরা জানান, সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে নিহতদের ব্যাপারে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। নিহত প্রবাসী ভাইদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং তাদের পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সরকারি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হবে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী মরহুমদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গকে এই অসীম কষ্ট সহ্য করার শক্তি দানের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা জানান।
এ নিয়ে গত তিন মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় কানাইঘাট উপজেলার আট প্রবাসীর মৃত্যু হয়েছে। গত জুনে কাতারে সড়ক দুর্ঘটনায় উপজেলার পাঁচ প্রবাসী নিহত হন। জুলাইয়ে সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় আরও একজন প্রবাসীর মৃত্যু হয়।