হোম > সারা দেশ > সিলেট

সিলেটে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবিতে ফেসবুক পোস্ট-সভা, যা বলছে প্রশাসন

সিলেট প্রতিনিধি

সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার লাউতা ইউনিয়নে সুনাই নদীতে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ আয়োজনকে কেন্দ্র করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। আগামী ২৮ আগস্ট নৌকাবাইচ আয়োজনের ঘোষণা দেওয়ার পর স্থানীয়দের একাংশ এটি বন্ধের দাবি জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একাধিক পোস্ট ও প্রতিবাদ সভা করেছেন।

আয়োজকদের অভিযোগ, নৌকাবাইচ বন্ধ করতে নানা ধরনের পাঁয়তারা করা হচ্ছে। বিরোধীরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এড়াতেই এই বিরোধিতা। এরই মধ্যে লাউতা ও বাহাদুরপুর যুব সমাজের উদ্যোগে আগামী ২৮ আগস্ট সুনাই নদীতে নৌকাবাইচ আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে বিভিন্ন এলাকার বাইচালরা ইতিমধ্যে নিবন্ধনও করেছেন।

নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি

সম্প্রতি নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। গত ১৮ আগস্ট রাতে মাসুম বিন নুর উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি ফেসবুকে একটি পোস্টার শেয়ার করেন। সেখানে ‘তৌহিদী জনতা লাউতা ইউনিয়ন’ নামটি ব্যবহার করা হয়। পরে ‘সুনাই নদীতে আগত নৌকাবাইচ বন্ধের প্রতিবাদে পরামর্শ সভা’ আয়োজনের কথা জানিয়ে আরেকটি পোস্ট দেওয়া হয়।

গত ২০ আগস্ট বারইগ্রাম বাজার মসজিদে ওই সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

ভিডিওতে এক ব্যক্তিকে নৌকাবাইচ বন্ধের পক্ষে বিভিন্ন কারণ তুলে ধরতে শোনা যায়। তিনি এলাকার পরিবেশ, ধর্মীয় পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নদীভাঙনের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেন। সভায় উপস্থিত আরেকজন অতীতের নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হতাহতের ঘটনা এবং কৃষিজমির ক্ষতির কথা তুলে ধরে এ ধরনের আয়োজন বন্ধের দাবি জানান।

তবে পোস্টারে নাম থাকা নুরুর রহমান বলেন, বিষয়টি কোনো ধর্মীয় বিষয় নয়, বরং সামাজিক ও জনস্বার্থের। ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে কারা পোস্টার করেছে, সে বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত নন। তাঁদের দাবি, অতীতে নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া নৌকাবাইচ ঘিরে গানের আসরকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও ঘটেছে। ফলে এবারও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা থেকেই তাঁরা আয়োজন বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে প্রতিবাদ সভা হয়েছে কি না জানতে চাইলে নুরুর রহমান বলেন, তাঁরা ওই ব্যানারে কোনো প্রতিবাদ করেননি। তাঁদের সঙ্গে লাউতার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রয়েছেন।

আয়োজকেরা যা বলছে

অন্যদিকে নৌকাবাইচ আয়োজক সংগঠনের সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, স্থানীয়ভাবে কিছু রাজনৈতিক কর্মী ফেসবুকে নৌকাবাইচের বিরোধিতা করছেন। কৃষকদের ফসলের ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরা হলেও নৌকাবাইচের সময়ের আগেই জমির চারা সরিয়ে নেওয়া হবে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, স্থানীয় কিছু লোক ছাড়া অধিকাংশ মানুষ নৌকাবাইচের পক্ষে রয়েছেন।

আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চায় প্রশাসন

লাউতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেলওয়ার হোসেন বলেন, নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটি স্থানীয় পর্যায়ের বিষয়। তবে অতীতে নৌকাবাইচ দেখতে আসা মানুষের কারণে কৃষিজমির ক্ষতি এবং প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে মারামারি ও বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়ভাবে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে হাবিবা মজুমদার বলেন, নৌকাবাইচ একটি স্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী আয়োজন। আয়োজকেরা প্রতিযোগিতার বিষয়ে প্রশাসনকে আগে থেকে জানাননি। একইভাবে বিরোধিতাকারীরাও তাঁদের আপত্তির বিষয়ে প্রশাসনকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানাননি।

উম্মে হাবিবা মজুমদার বলেন, ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবির বিষয়টি প্রশাসনের জানা নেই। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে একটি বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে যৌক্তিক সমাধান নিশ্চিত করা হবে।

ইউএনও আরও বলেন, গ্রামীণ খেলাধুলা ও ঐতিহ্যগুলো টিকিয়ে রাখার বিষয়ে প্রশাসন ইতিবাচক। তবে একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের উদ্বেগ ও আইনশৃঙ্খলার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।