সিলেটে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। হামের জন্য ডেডিকেটেড হাসপাতালে ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ রোগী ভর্তি রয়েছে। আবার অনেক শিশুর অভিভাবক শয্যা না পেয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছেন। এই পরিস্থিতিতে সিলেটে গতকাল সোমবার হামের উপসর্গ নিয়ে ৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত বা উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রোগীর চাপ সামলাতে চলতি বছরের ২৬ মার্চ থেকে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট শহীদ শামসুদ্দীন আহমদ হাসপাতালকে হামের জন্য ডেডিকেটেড করা হয়। এখানে বর্তমানে ১৬২ জন রোগী ভর্তি আছে। কোনো শয্যায় দুজন করে আবার কোথাও মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছে অনেক শিশু। এদিকে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৮ শয্যার বিপরীতে বর্তমানে রোগী ভর্তি আছে ১৮৬ জন। যেখানে প্রতি শয্যায় ৩ জন করে এবং বাইরে, লিফটের পাশে মেঝেতেও শয্যা বিছিয়ে ভর্তি আছে রোগী।
সিলেটের বেসরকারি হাসপাতালের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। পার্কভিউ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছে ৩০ জন, রাগীব রাবেয়া মেডিকেলে ১০ জন, বিভিন্ন উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও বেগতিক অবস্থা।
শহীদ শামসুদ্দীন আহমদ হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি পাওয়া অনেক ওষুধ এখন শেষ হয়ে যাচ্ছে। আছে পর্যাপ্ত জনবলের অভাব। আবার এখানে যারা এসে ঘুরে যায়, তাদেরই অনেকে আবার হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসে ভর্তি হয়।
শহীদ শামসুদ্দীন আহমদ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. খসরুজ্জামান রনি বলেন, এখানে ভর্তি হওয়া ১৬২ জনের মধ্যে অধিকাংশই শিশু। আর হাসপাতালে শিশুবিশেষজ্ঞ মাত্র দুজন। এমন অবস্থায় সবাই নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে চিকিৎসা দিচ্ছেন। এখানে হাম বা হামের উপসর্গ নিয়ে যারাই মারা যাচ্ছে, তাদের প্রায় সবাই আইসিইউতে মারা যাচ্ছে। তারা শুধু হামের জন্য মারা যাচ্ছে না, সঙ্গে আরও বিভিন্ন রোগ রয়েছে। যার কারণে হামের শুধু উপসর্গ থাকে আর অন্য রোগে তারা মারা যায়। নিউমোনিয়া, হার্টে সমস্যাসহ নানা রোগে আক্রান্ত থাকায় তারা মারা যায়।
শহীদ শামসুদ্দীন আহমদ হাসপাতালে মেয়ে ওয়াজিহাকে নিয়ে থাকা অজির উদ্দিন বলেন, হাসপাতালে কষ্ট করে থাকতে হচ্ছে এক বেডে দুজন করে। তবে চিকিৎসা ভালোই মিলছে।
জনায়েদ আহমদ নামের আরেকজন বলেন, ‘আমার ভাগনিকে অসুস্থ হওয়ার পর ভর্তি করার জন্য ওসমানী হাসপাতালে যাই। সেখানে সিট না পেয়ে আরও ৪টি বেসরকারি হাসপাতালে গিয়েও সিট পাইনি। পরে পার্কভিউতে গিয়ে কোনোরকমে একটি সিট পাই। এখানেও সিট আর খালি নেই।’
এদিকে ১০ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিলেটে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৫ শিশুর মৃত্যু হয়। আর শুধু গতকালই হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৪ শিশু। এর মধ্যে সিলেটের কানাইঘাটের ১০ বছর বয়সী এমরান হোসেন, জকিগঞ্জের ৭ মাস বয়সী ওবায়দুল্লাহ, হবিগঞ্জের বাহুবলের ১০ মাস বয়সী সাফায়েত, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের ৩ বছর ৩ মাস বয়সী খাদিজা। তাদের মধ্যে এমরান হোসেন শহীদ শামসুদ্দীন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। আর বাকিরা সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছে।
গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেট কার্যালয়ের তথ্যমতে, ১ জানুয়ারি থেকে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিলেটে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ৪৪ জন। আর এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত ১০ রোগীসহ মারা গেছে ১৬৪ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছে ১৪৬ জন রোগী। সব মিলিয়ে বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি আছে ৪৯৫ জন।
স্বাস্থ্য বিভাগ সিলেটের সহকারী পরিচালক (রোগনিয়ন্ত্রণ) ডা. মোহাম্মদ নূরে আলম শামীম বলেন, ‘আমরা নির্দেশনা দিয়েছি প্রতি উপজেলায়, যাতে করে অবস্থা বেশি খারাপ না হলে সেখানকার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই চিকিৎসা দেওয়া হয়। আর সংকটাপন্ন হলে যেন শহরে পাঠানো হয়। কিন্তু অনেকের অবস্থা ততটা খারাপ না থাকলেও এখানে আসেন আর চাপ বৃদ্ধি পায়। এটি তো একজনের দেহ থেকে অন্যজনে ছড়ায়। এভাবে আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সচেতনতার বিকল্প নেই।’