চারদিকে থইথই পানি। এরই মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন। হাওরের মধ্যে নির্মিত বিদ্যালয়টির আশপাশের পথঘাট বর্ষার পানি বৃদ্ধির কারণে ডুবে গেছে। ফলে দূরদূরান্ত থেকে শিশুশিক্ষার্থীদের নৌকা বেয়ে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে এখানে ক্লাস করতে আসতে হচ্ছে। সম্প্রতি সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার বাহাড়া ইউনিয়নের ভেড়া ডহর হাওর এলাকায় মির্জাকান্দা নতুন হাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে এমন দুর্ভোগের চিত্র দেখা যায়।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে ১ হাজার ৪৭৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদ্যালয় হাওরের জলাবদ্ধতায় পড়েছে। এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যাতায়াতব্যবস্থা খুবই নাজুক। পানি ও বৃষ্টির মধ্যে তাদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতে তাদের সীমাহীন দুর্ভোগে পড়তে হয়। দুর্ঘটনার ঝুঁকি মাথা মেনে নিয়েই অভিভাবকেরা তাঁদের শিশুসন্তানদের বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করাতে পাঠিয়ে আসছেন। তবে এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতি অনেকাংশ কমে গেছে বলে শিক্ষকেরা জানিয়েছেন।
সরেজমিনে জানা গেছে, হাওরের মাঝখানে ছোট ছোট পাড়া মিলে শাল্লার বাহাড়া ইউনিয়নের ভেড়া ডহর হাওর এলাকায় মির্জাপুর গ্রাম গড়ে উঠেছে। এর এক পাশে মির্জাকান্দা নতুন হাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, অপর পাশে মির্জাকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থান। দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটিতে শিক্ষার্থী আছে ৭৬ জন ও অন্যটিতে ৯৪ জন। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের ওই গ্রামের সব ছাত্রছাত্রী দরিদ্র পরিবারের। তারা নিজেরা নৌকা বেয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করে। ঝড়-বৃষ্টি থাকলে উপস্থিতি কমে যায় বলছেন শিক্ষক ও স্থানীয়রা।
বিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী নতুন হাটির সাইদুর রহমানের তিন ছেলেমেয়ে। ছোট ছেলে আইজুল প্রথম শ্রেণির ছাত্র। একমাত্র মেয়ে রিয়া মনির পড়ালেখা চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত সমাপ্ত। বড় ছেলে কোনোরকম প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করলেও নানা বাধার কারণে শিক্ষাজীবন আর এগোয়নি।
স্কুলে যাওয়ার পথে বাড়ির পার্শ্ববর্তী প্রায় ৩০০ ফুট রাস্তায় মাটি ফেলার অনুরোধ জানিয়ে সাইদুর রহমান বলেন, ‘কেউ পানি ভাইঙ্গা যায়। কেউ নৌকা দিয়া। স্কুলে আসা-যাওয়ার একটা নৌকা দিলে খুব ভালো হয়।’
মির্জাকান্দা নতুন হাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক চমক কান্তি তালুকদার বলেন, ‘আমরা এক্কেবারে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন। চারপাশে শুধু পানি। ছাত্রছাত্রীরা নৌকা বেয়েই স্কুলে আসে। আবহাওয়া খারাপ থাকলে ছাত্ররা তেমন আসে না।’
একই দৃশ্য দেখা যায় লামাগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়টি অবস্থান তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওরের পারে। ১৪২ ছাত্রছাত্রী পড়ালেখা করছে ওই বিদ্যালয়ে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাসরিন আক্তারের ভাষ্য, আবহাওয়া খারাপ থাকলে অনেক ছাত্রছাত্রী স্কুলে আসে না।
লামাগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. আরিফ ও ইসরাত জাহান নোহা জানিয়েছে, তাদের নৌকা বেয়ে ও সাঁকো পার হয়ে বিদ্যালয়ে আসতে হয়। অনেকের নৌকা নেই। বৃষ্টি থাকলে বইপত্র ও কাপড়চোপড় ভিজে যায়। ভেজা শরীরে ক্লাস করতে হয়।
হাওরবেষ্টিত আরেক উপজেলা মধ্যনগরের রংচি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ আমজোড়া নুরুন্নাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আমজোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়; তাহিরপুরের জয়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সাহেবনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়; জামালগঞ্জ উপজেলার হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফেনারবাঁক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়; শাল্লার শান্তিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইয়ারাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও যাত্রাপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহন লাল দাস বলেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী তাহিরপুরে বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন। হাওর এলাকার শিক্ষার বিভিন্ন সমস্যা তাঁকে বলা হয়েছে। বর্ষাকালে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াতের বিষয়টি তিনি অবহিত হয়েছেন।