হাওরে বোরো ধানের ফলন কমেছে, কমেছে দামও। কিন্তু সবচেয়ে বড় সংকট—ধান কেনার মতো ক্রেতা নেই। উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন সুনামগঞ্জের কৃষকেরা। সরকার-নির্ধারিত দামে গুদামে ধান বিক্রির জটিলতা আর খোলাবাজারে ক্রেতাসংকটে দেনা-দায় ও সংসারের খরচ মেটাতে ফড়িয়াদের পিছু ছুটছেন তাঁরা। ফলে একফসলি এই অঞ্চলের কৃষকদের ঘরে এখন ধান থাকলেও স্বস্তি নেই।
দিরাই উপজেলার উদগল হাওরপারের ধনপুর গ্রামের কৃষক রাজা মিয়া বলেন, ‘গেল বোরো মৌসুমে খেত ডুবে ও পচে নষ্ট হওয়ায় আশানুরূপ ফলন হইছে না। ২১ কিয়ার (৩০ শতকে ১ কিয়ার) জমি কইরা ৮০ মণের মতো ধান পাইছি। এর মাঝে ধানের দাম কম। ধান কিনার মতো লোক নাই।’
কৃষকের অবস্থা খারাপ উল্লেখ করে রাজা আরও বলেন, ‘ভালো ধানের দর মণপ্রতি সর্বোচ্চ ৮০০ থেকে সাড়ে ৮০০ টাকা। একটু দুর্বল ধান ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মণ দরে মানুষ হাঁসের খামারিদের কাছে বিক্রি করতাছে।’
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উৎপাদন খরচের কম দামেও ধান বিক্রি করতে পারছেন না বোরোচাষিরা। নানা হয়রানি-উৎপাতে সরকার-নির্ধারিত মূল্যে ধান বিক্রি করতে গুদামমুখী হননি অনেকে। পারিবারিক ব্যয় সামলানোর পাশাপাশি দেনা পরিশোধে ধান বিক্রি ছাড়া উপায়ও নেই তাঁদের। তাই বাধ্য হয়ে ফড়িয়াদের পিছু ছুটছেন।
কৃষকেরা জানান, এক ফসলি এলাকাখ্যাত সুনামগঞ্জের ৮০ শতাংশের বেশি মানুষের আয়-ব্যয়ের মাধ্যম বোরো ধান। ধান বিক্রির টাকায় চলে তাঁদের বিয়ে, অনুষ্ঠান, লেখাপড়া, চিকিৎসা, পোশাকপরিচ্ছদ, কৃষিকাজসহ যাবতীয় খরচাপাতি।
গত বোরো মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওর তলিয়ে ধান নষ্ট হওয়ায় কৃষক এমনিতেই ক্ষতিগ্রস্ত। এর মাঝে কম দাম দিয়েও ধান বিক্রি করতে না পারায় হতাশ হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে ছোট-বড় ১৯৩ হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। প্রায় ১৪ লাখ টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ধান হয়েছে ১২ লাখ ৯৮ হাজার ৪০০ টন। জেলায় বোরোচাষি প্রায় ৪ লাখ। এর মধ্যে কার্ডধারী ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৭; ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক ২ লাখ ২৩ হাজার ৮০৭ জন।
ধান কেনাবেচায় জেলার প্রধান ও প্রসিদ্ধ হাট মধ্যনগর। ধানের হাট হিসেবে সুনাম থাকলেও এ বাজারে ধান নিয়ে আসতে তেমন দেখা যায়নি কৃষকদের। গত ২৯ আগস্ট শনিবার সাপ্তাহিক হাটের দিন মধ্যনগর বাজারে গিয়ে অলস সময় কাটাতে দেখা যায় আড়তদারদের।
বাজারের আড়তসংশ্লিষ্ট লোকজনের ভাষ্য, বিগত বছরগুলোতে এ সময়টায় একেকটি আড়তে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১ হাজার ১০০ মণ ধান কেনা হতো। আশপাশের হাওরাঞ্চলের গ্রাম থেকে ধান নিয়ে বাজারে আসতেন কৃষকেরা। এ বছর ব্যাপারীরাও তেমন আসছেন না। খোলাবাজারে ধানের দাম কম থাকায় কৃষক-ফড়িয়াও কম। ফলে মধ্যনগর বাজারের ছোট-বড় অর্ধশতাধিক ধানের আড়তে কৃষক-শ্রমিকের হাঁকডাক নেই।
মধ্যনগর বাজারের তমা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী জসীম উদ্দিন বলেন, ‘ধানের বাজার একবারে মন্দা। একটু নিয়ম (দুর্বল) ধান মণপ্রতি ৬০০ থেকে ৭০০, ভালো মানের ধান ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ১৫০ টাকা। বিগত বছরগুলোতে দৈনিক ৭০০ থেকে ৮০০ মণ ধান কেনা সম্ভব হলেও এবার তা ১৫০ থেকে ২০০ মণে দাঁড়িয়েছে। ধান কেনার পর আমরা আশুগঞ্জের ব্যাপারীদের কাছে বিক্রি করি। অর্থাভাবে ব্যাপারীরাও বাজারে তেমন আসছেন না।’
ধানের হাটে দেখা হয় মধ্যনগর ইউনিয়নের কান্দাপাড়া গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে। তিনি ২৬ কিয়ার (৩০ শতকে ১ কিয়ার) জমি আবাদ করে ধান পেয়েছেন প্রায় ৫০০ মণ। মণপ্রতি উৎপাদন খরচ প্রায় ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা। কিন্তু ৯০০ টাকা দরে ধান বিক্রি করেছেন তিনি। জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘৯০০ টাকা দরে বাকিতে হাঁসের ফার্মের মালিকের কাছে ৬০ মণ ধান বিক্রি করছি। চাষাবাদের খরচও উঠছে না। ধান কেনার মতো মানুষ নাই। কৃষকের অবস্থা খুব খারাপ।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জের ধান ক্রেতা প্রতিষ্ঠান মীম আছিয়া ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ইকবাল হোসেন বলেন, ‘আমরা ধান কিনে চাল করে তা বিক্রি করি। কিন্তু ধানের দাম, চালের দামে মিল নাই। পড়তায় পড়ে না।’ দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ভালো না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরাই ধান কম নিচ্ছি। শুধু ধান কিনলেই হবে না, বিক্রিও করতে হবে। লোকসান হওয়ায় ধান কম কম কেনা হয়।’
সুনামগঞ্জ খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) ফেরদৌস জাহান জানিয়েছেন, জেলায় এ বছর মণপ্রতি ১ হাজার ৪৪০ টাকায় প্রায় ২১ হাজার টন ধান সংগ্রহের কথা ছিল। কিন্তু সংগ্রহ হয়েছে ১ হাজার টনের কম। দেশব্যাপী লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ধান সংগ্রহ হয়েছে। যে কারণে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশক্রমে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শেষ হয়েছে।