হোম > সারা দেশ > সিরাজগঞ্জ

‘৩ হাজার টাকার’ দোকানই প্রতিবন্ধী হারুনের ভরসা

আব্দুল্লাহ আল মারুফ, সিরাজগঞ্জ

প্রতিবন্ধী হারুনের একমাত্র ভরসা এই দোকানটি। ছবি: আজকের পত্রিকা

ছোট্ট টিনের ঘর। ঘরের এক পাশে কাঠের চৌকি। তার ওপর সারি করে রাখা বিস্কুট, কেক, চানাচুরসহ নানা ধরনের মুদি পণ্য। টিনের বেড়াতেও ঝুলছে কয়েকটি প্যাকেট। পাশে তিন-চারটি প্লাস্টিকের চেয়ার। কাঠের একটি টেবিলে রাখা ফ্লাস্ক, কয়েকটি কাপ ও চায়ের পাতা।

সব মিলিয়ে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকার পণ্য। এই ছোট দোকানটিই ২৮ বছর বয়সী মো. হারুনের ভরসা। দোকান থেকে দিনে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা আয় হয়। সেই আয়েই চলে বাবা-মা, এক ভাগনিকে নিয়ে চারজনের সংসার।

প্রতিবন্ধী হারুনের বাড়ি সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার খাসরাজবাড়ী চরে। কয়েক বছর আগে নদীভাঙনে সেই বাড়ি চলে গেছে নদীর গর্ভে। এখন অন্যের সাত শতাংশ জায়গায় টিনের ঘর তুলে বসবাস করেন তাঁরা।

সম্প্রতি খাসরাজবাড়ী চরে গিয়ে হারুনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের বাড়ি নদীর পাশেই ছিল। বছর খানেক আগে নদীতে ভেঙে গেছে। এরপর অন্যের জায়গায় ঘর তুলে থাকছি। নিজের জায়গা-জমি কিছুই নেই।’

ছোটবেলায় স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন হারুন। নদীভাঙনের পর তাঁর পড়াশোনাও থেমে যায়। দুই বোনের একজনের বিয়ে হয়েছে গ্রামেই। আরেকজন ঢাকায় থাকেন এবং চাকরি করেন।

সকাল থেকে ছোট দোকানটিতে বসেন হারুন। দিন শেষে ২০০ থেকে ২৫০ টাকার মতো আয় হয়। দোকানের কাজে তাঁকে সহযোগিতা করেন তাঁর বাবা সাত্তার শেখ।

হারুন বলেন, ‘দোকানের আয় আর তিন মাস পরপর ২ হাজার ৫০০ টাকা প্রতিবন্ধী ভাতা পাই। সব মিলিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হয়।’

নিজের জীবনের আরেকটি কষ্টের কথাও জানান হারুন। চার বছর আগে বিয়ে করেছিলেন। এক বছর পর স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। হারুন বলেন, টাকা-পয়সা না থাকার কারণে সংসারটা টেকেনি।

পাশে বসে থাকা বৃদ্ধ বাবার দিকে তাকিয়ে হারুন বলেন, ‘বাবা-মা বৃদ্ধ হয়ে গেছে। তাঁদের কষ্ট দেখলে ভালো লাগে না।’

সরকারের কাছে নিজের জন্য কোনো চাওয়া আছে কি না জানতে চাইলে হারুন নিজের কথা না বলে চরের মানুষের কথাই বলেন। তাঁর ভাষায়, চরের মানুষের অনেক কষ্ট। নদীভাঙনে অনেকের ঘরবাড়ি চলে গেছে। মানুষের সমস্যাগুলো সরকার খোঁজ নিয়ে সমাধান করলেই তিনি খুশি।

প্রমত্তা যমুনা হারুনের বাড়ি কেড়ে নিয়েছে। থেমে গেছে পড়াশোনা, টেকেনি সংসার। এখন অন্যের জায়গায় ছোট্ট টিনের ঘর আর কয়েক হাজার টাকার মুদি পণ্য সাজানো দোকানটিই তাঁর ভরসা।

যমুনার পাড়ে সেই ছোট্ট দোকানে বসে প্রতিদিন ক্রেতার অপেক্ষা করেন হারুন। কেউ এলে হয়তো কয়েক টাকার বিস্কুট, চানাচুর কিংবা এক কাপ চা বিক্রি হবে। আর সেই বিক্রির টাকাতেই চলবে তাঁর পরিবারের আরেকটি দিন।