হোম > সারা দেশ > সিরাজগঞ্জ

‘পাঁচ বিঘা জমিতে দরকার ১০ বস্তা সার, মিলেছে এক বস্তা’

আব্দুল্লাহ আল মারুফ, সিরাজগঞ্জ

কোদাল দিয়ে জমি প্রস্তুত করছেন কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন কৃষক রেজাউল করিম। কাজীপুরের রাজবাড়ী থেকে আজ সকালে তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

চরের মাটিতে কোথাও আমন ধানের চারা রোপণ করা হয়েছে, কোথাও চলছে জমি প্রস্তুতের কাজ। আমন আবাদ নিয়ে কৃষকদের ব্যস্ততা থাকলেও তাঁদের মনে স্বস্তি নেই। জমিতে রোপণ করা ধানের জন্য চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার খাসরাজবাড়ী ইউনিয়নের রাজবাড়ী চরের কৃষকেরা।

রাজবাড়ী চরের কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান পাঁচ বিঘা জমিতে আমন ধান আবাদ করছেন। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, ওই জমিতে অন্তত ১০ বস্তা সার প্রয়োজন। কিন্তু এখন পর্যন্ত পেয়েছেন মাত্র এক বস্তা।

৫৫ বছর বয়সী মোস্তাফিজুর বলেন, ‘পাঁচ বিঘা জমিতে সার লাগবে ১০ বস্তা, দেয় এক বস্তা। এইভাবে ধান চাষ তো করতে পারব না। আমাদের কৃষি ধ্বংস হয়ে যাবে।’

মোস্তাফিজুরের পরিবারের সদস্য সাতজন। ধান, ভুট্টা ও মরিচ চাষ করেই চলে তাঁদের সংসার। তাঁর অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত দাম অনুযায়ী প্রতি বস্তা সারের মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা। ওই দামে তিনি এক বস্তা সার পেয়েছেন। জমির পরিমাণ অনুযায়ী সার চাইলে ডিলাররা সার নেই বলে জানান। তবে মাঝে মাঝে ১ হাজার ৭৫০ টাকা দিলে সার পাওয়া যায় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, এর পেছনে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে।

মোস্তাফিজুর বলেন, ‘সার-তেল যদি আমরা ঠিকমতো না পাই, তাহলে পরিবার নিয়ে কীভাবে বাঁচব?’

একই অভিযোগ করেন কৃষক রেজাউল করিম। তিনি সাত বিঘা জমিতে আমন ধানের আবাদ করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত পেয়েছেন এক বস্তা সার। তাঁর অভিযোগ, সরকারি দামের চেয়ে বেশি টাকা দিলে সার পাওয়া যাচ্ছে।

আরেক কৃষক রুস্তম আলী বলেন, চরাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ ধান ও ভুট্টা চাষ করে সংসার চালান। বর্তমানে ধানের আবাদ চলছে। সামনে ভুট্টার আবাদ শুরু হবে। সার নিয়ে এখনই সমস্যা হলে তখন পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে। তিনি বলেন, ‘কয়েক দিন পর ভুট্টার আবাদ শুরু হবে। এখনই যদি সার নিয়ে সমস্যা হয়, তখন কী হবে? আমরা সরকারের কাছে ন্যায্যমূল্যে সহজভাবে সার চাই।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, চরাঞ্চলে সাড়ে সাত হাজারের বেশি মানুষ কৃষির সঙ্গে যুক্ত। সার ও জ্বালানি তেলের সংকটে তাঁরা বিপাকে পড়েছেন বলেও অভিযোগ তাঁদের। পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে কৃষকেরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন বলেও জানান তাঁরা।

তবে উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্য বলছে, উপজেলায় সারের সংকট নেই। বৃহস্পতিবার রাতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কাজীপুরে ইউরিয়ার বরাদ্দ ছিল ৪৮৬ টন এবং পুরো বরাদ্দই উত্তোলন করা হয়েছে। ১৬৪ টন টিএসপির বরাদ্দের মধ্যে উত্তোলন হয়েছে ১৫৮ দশমিক ১৫ টন। ডিএপি ও এমওপির বরাদ্দ ছিল যথাক্রমে ২৫৪ ও ১৩৩ টন; দুটিরই পুরো বরাদ্দ উত্তোলন করা হয়েছে।

কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার উপজেলায় ডিএপি মজুত ছিল ১২৬ টন, টিএসপি ৫৯ টন, এমওপি ১৪৩ টন এবং ইউরিয়া ১২ টন। উপজেলায় বিসিআইসি ডিলার রয়েছেন ১৭ জন এবং বিএডিসি ডিলার ১১ জন।

বরাদ্দ ও মজুত থাকার পরও কৃষকেরা কেন চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না—এ বিষয়ে কাজীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘সারের কোনো সংকট নেই। কেউ যদি সারের অতিরিক্ত দাম নেন, সে ক্ষেত্রে কৃষকের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম মনজুরে মাওলা শুক্রবার সকালে আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সারের কোনো সংকট নেই। জমির পরিমাণ অনুযায়ী কৃষকেরা পর্যাপ্ত সার পাচ্ছেন। যে ফসলের জন্য যতটুকু সার প্রয়োজন, ঠিক ততটুকুই দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘কেউ যদি ভুট্টা চাষের জন্য আগেই সার চান, তা এখন দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ, এখনো ভুট্টা চাষ শুরু হয়নি। ভুট্টা চাষ শুরু হতে আরও প্রায় দুই মাস বাকি। আর কেউ সারের জন্য অতিরিক্ত দাম নিলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’