হোম > সারা দেশ > সিরাজগঞ্জ

বন বিভাগ গাছ কাটলেও জানে না জেলা প্রশাসন

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

গাছ কেটে রাখা হয়েছে সড়কের পাশে। গত শনিবার সুনামগঞ্জ-সাচনা বাজার সড়কের ইসলামগঞ্জ এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

পরিবেশকর্মী এবং স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ (সাচনা বাজার) সড়কের গাছ কাটা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল জেলা প্রশাসন। তবে সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে গত ১৫ দিনে সড়কটির অর্ধেকের বেশি গাছ কেটে নিয়েছে বন বিভাগ। জেলা প্রশাসনের দাবি, তাদের না জানিয়েই গাছ কাটা হয়েছে। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। এদিকে পরিবেশকর্মী ও স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, কয়েক কোটি টাকার গাছ নামমাত্র দামে বিক্রি করে ফায়দা লুটছে বন বিভাগ।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ-সাচনা বাজার সড়কে গাছ আছে ৪ হাজার ৪০০টি। সদর উপজেলার অংশ ২৮ লাখ ৩৬ হাজার এবং জামালগঞ্জ অংশের গাছগুলো ৫৬ লাখ ৪৪ হাজারসহ মোট ৮৪ লাখ ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। সেই মোতাবেক প্রতিটি গাছের গড় মূল্য ১ হাজার ৯২৭ টাকা ২৭ পয়সা। বন বিভাগের তালিকাভুক্ত টাঙ্গাইলের ২টি, সিলেটের ১টি, দোয়ারাবাজারের ১টিসহ মোট ৪টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে গাছ কাটার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।

সামাজিক বনায়ন বিধিমালা অনুযায়ী, গাছ বিক্রির টাকা উপকারভোগী ৫৫, বন অধিদপ্তর ১০, ভূমির মালিক হিসেবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) ২০, ইউনিয়ন পরিষদ ৫ শতাংশ পাবে। বাকি টাকা দিয়ে আবার বনায়ন করা হবে। পরিবেশকর্মীদের ভাষ্য, এসব বৃক্ষ নিধনের মাধ্যমে সড়কের সৌন্দর্য ও প্রকৃতির মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ সড়কের দুই পাশে রেইনট্রি, কড়ই, আকাশি, অর্জুন, মেরাসহ ফলদ, বনজ এবং ঔষধি জাতের অন্তত ১০ প্রজাতির গাছ রয়েছে। ২০-২৫ বছর আগে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় গাছগুলো লাগানো হয়। স্থানীয়দের দেখাশোনা ও পরিচর্যায় ধীরে ধীরে এগুলো প্রকৃতির আধারে রূপ নিয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে কর্তন করা গাছের বড় বড় টুকরা। কোনো কোনো অংশে গাছ কাটতে দেখা যায় শ্রমিকদের। অনেক জায়গার গাছ কেটে নেওয়ায় খালি খালি লাগছে ব্যস্ততম সড়কটি। পাখপাখালির আশ্রয় এবং মানুষের ছায়াদানের পরিবেশ ধ্বংস করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে।

সদর উপজেলার ইচ্ছারচর গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘গাছ কাটার ব্যাপারে আমরা কিছু জানি না। কইছে, যেগুলা সিল মারছে, এইগুলা কাইট্যা নিব। আমরা নিজের উদ্যোগেও অনেক গাছ লাগাইছি। এইগুলাও কাইট্যা নিছে। আমরা প্রতিবাদ করছি, মানছে না। গাছ প্রকৃতি ও পরিবেশের লাগি ভালা। গাছ কাটায় অখন খোলা ময়দানে পইড়া গেছি।’

সুনামগঞ্জের আব্দুজ জহুর সেতু থেকে জামালগঞ্জের সাচনা বাজার পর্যন্ত সড়কের দূরত্ব ১৯ কিলোমিটার। সদরের টুকের বাজার, গৌরারং, ইচ্ছারচর, বেড়াজালি, ইসলামগঞ্জ, আহমদাবাদ, নিয়ামতপুর, শালমারা, কলায়া ও বিশ্বম্ভরপুরের দুলবারচর, সংগ্রামপুর এবং জামালগঞ্জের শেরমস্তপুর, নজাতপুর, কুকড়াপশী পর্যন্ত সড়কে গাছ আছে অন্তত সাড়ে ৪ হাজার।

সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামের আতাউর রহমান বলেন, ‘শতকরা ৫৫ টেকা পাইমু, এই হিসাবে বিশ-পঁচিশ বছর আগে গাছ লাগানি হইছে। যারা কাটতাছে, জিগাইলে কয়, তারা আড়াই শ টাকা ফুট কিনছে। এই গাছের বাজারমূল্য আছে ৮০০ টাকা। আমরারে না জানাইয়া মাগনা দামে গাছ বিক্রি কইরা দিছে। আমরা এর জবাব চাই।’

২০২৪ সালের মার্চ মাসে সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ সড়কের এ গাছগুলো কাটার উদ্যোগ নিয়েছিল বন বিভাগ। তখন বাকল কেটে লাল কালিতে নম্বর দেওয়া হয়েছিল প্রতিটি গাছে। স্থানীয় লোকজনকে গণনার ধোঁকা দিয়ে সেবার গাছ বিক্রির দরপত্র আহ্বানও করা হয়। কিন্তু গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ এবং প্রতিবাদের মুখে ভেস্তে যায় এই উদ্যোগ। শেষ পর্যন্ত উড়ালসড়ক প্রকল্পের কাজে রাস্তা প্রশস্তকরণে ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে গাছ কর্তনের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ বন বিভাগের বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সুনামগঞ্জের সভাপতি তৈয়বুর রহমান বাবুল বলেন, গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ জেলার সবচেয়ে সুন্দর সড়ক এটি। অন্য কোনো রাস্তায় সুনামগঞ্জ-সাচনা বাজার সড়কের মতো এ রকম গাছ নেই। হাওর ভাটির জেলায় এমনিতেই বন-জঙ্গল কমে গেছে। এর মধ্যে সড়কের গাছ কেটে ফেলা মানে প্রকৃতির বড় ধরনের ক্ষতি করা। কর্তনের অবশিষ্ট গাছগুলো যেন বেঁচে থাকে এবং কর্তন করা জায়গায় যেন পুনরায় গাছ রোপণ করা হয়।

সুনামগঞ্জ বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে গাছগুলো বিক্রি হয়েছে। সামাজিক বনায়নের মেয়াদ বেশ আগে পূর্ণ হওয়ায় পরিপক্ব হয়ে অনেক গাছ মরে যাচ্ছে। যে কারণে কর্তনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ থেকে উপকারভোগীরা লভ্যাংশ পাবে। স্থানীয়দের যাঁরা কমিটিতে আছেন, তাঁদের নিয়েই সিদ্ধান্ত হয়েছে।’

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান বলেন, ‘পরবর্তী নির্দেশ দেওয়ার আগপর্যন্ত গাছ কাটা বন্ধ থাকবে। যেসব গাছ কাটা হয়েছে, সেগুলো বন বিভাগের হেফাজতে থাকবে।’

এক প্রশ্নে মতিউর রহমান বলেন, ‘এ ধরনের গাছ কাটতে হলে অবশ্যই ডিসি স্যারসহ জেলার যে কমিটি আছে, সেই কমিটিকে অবহিত করার কথা। কিন্তু বন বিভাগ থেকে আমরা অবহিতকরণের কোনো তথ্য পাইনি।’ এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।