হোম > সারা দেশ > রংপুর

রমেক হাসপাতাল: এক শয্যায় তিন-চার শিশু

শিপুল ইসলাম, রংপুর 

শয্যার অধিক রোগী ভর্তি থাকায় এক শয্যায় একাধিক শিশুকে দেওয়া হচ্ছে চিকিৎসা। গতকাল রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে। আজকের পত্রিকা

রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের শিশু বিভাগে ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছে শিশু ও স্বজনেরা। এক শয্যায় তিন-চার শিশুর পাশাপাশি মেঝেতেও চলছে চিকিৎসা। অথচ প্রায় সাত বছর আগে নির্মাণ শেষ হওয়া ১০০ শয্যার আধুনিক শিশু হাসপাতালটি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ৮, ৯ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে শিশু বিভাগ। এখানে মোট শয্যা রয়েছে ৮৬টি। এর বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ভর্তি থাকে ২৬০-৩০০ জন। এখানে ১৫০ নার্সের বিপরীতে মাত্র ৫০ জন কর্মরত রয়েছেন। গত সেপ্টেম্বরে ৫৯ শিশু মারা গেছে। মারা যাওয়া শিশুরা কেউই হামে আক্রান্ত নয়।

অতিরিক্ত চাপে একেকটি শয্যায় তিন-চার শিশুকে রাখতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসাসেবায় চাপ বাড়ার পাশাপাশি সংক্রমণের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। অথচ এই চাপ কমানোর জন্য নগর ভবনের অদূরেই ১০০ শয্যার একটি আধুনিক শিশু হাসপাতাল নির্মাণ শেষ হয়েছে প্রায় সাত বছর আগে। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, অন্যান্য জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম না থাকায় এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি।

রমেকে হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আ ন ম তানভীর চৌধুরী বলেন, ‘নির্ধারিত শয্যার তুলনায় শিশু রোগীর চাপ অনেক বেশি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি শয্যায় তিন-চারজন বা তারও বেশি রোগী রাখতে হয়। এতে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর চাপ বাড়ে। পাশাপাশি নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কিওলাইটিসসহ সংক্রামক রোগের রোগী থাকায় অতিরিক্ত ভিড়ে সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ে।’

কুড়িগ্রামের কচাকাটা থেকে চার মাস বয়সী শিশুকে নিয়ে এসেছেন সুমি আক্তার। নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে তাঁর সন্তান চার দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। প্রথম তিন দিন মেঝেতে কাটিয়েছে। পরে একটি শয্যায় জায়গা মিললেও সেখানে আরও তিন শিশু রয়েছে। সুমি বলেন, ‘বাচ্চার শ্বাসকষ্ট। চার দিন ধরি আছি। বেডোত জায়গা পাইনি। এত বড় হাসপাতালে বাচ্চার থাকার জায়গা নাই।’

রংপুর সদরের মমিনপুরের মমতা বেগম সাত দিন ধরে সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে আছেন। তিনি বলেন, ‘ভালো চিকিৎসার জন্য এটে আসছি। কিন্তু জায়গা নাই। বাচ্চাক নিয়া খুব দুশ্চিন্তায় আছি। এখানে প্রতিদিন দু-তিনটা করি বাচ্চা মারা যায়।’

শিশু বিভাগের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের নার্স ইনচার্জ ডলি খাতুন জানান, তাঁর ওয়ার্ডে শয্যা ৪০টি। অথচ ভর্তি রোগী থাকে প্রায় ১৮০ জন। শীত এলে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নার্সের সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় কম।

শিশু বিভাগের আরেকটি বড় সংকট ফটোথেরাপি নিয়ে। জন্ডিসে আক্রান্ত নবজাতকের চিকিৎসায় এই যন্ত্র প্রয়োজন হলেও রোগীর তুলনায় যন্ত্রের সংখ্যা কম বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন।

গাইবান্ধা থেকে নবজাতক সন্তানকে নিয়ে ৩১ দিন ধরে রমেকে আছেন ইসমাইল হোসেন। তাঁর অভিযোগ, একই ফটোথেরাপি মেশিনে একসঙ্গে দুটি শিশুকে রাখা হচ্ছে। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।

রমেকের এই চাপ কমাতে নির্মিত ১০০ শয্যার শিশু হাসপাতালটিতে জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ, চিকিৎসকদের কক্ষ, ল্যাব, অপারেশন থিয়েটার, বিশেষায়িত ইউনিট, ওয়ার্ড ও কেবিনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অথচ অধিকাংশ কক্ষই এখনো অব্যবহৃত।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের জুনে হাসপাতালটির জন্য ৬৫৯ জনবল চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। বর্তমানে সেখানে বহির্বিভাগে শিশু রোগী দেখা হচ্ছে; কিন্তু ভর্তি ও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালু হয়নি।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. ওয়াজেদ আলী বলেন, ‘সম্প্রতি হাসপাতালটিতে তিন গাড়ি আসবাবপত্র এসেছে। চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি কবে আসবে তা জানি না। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।’

রমেকে হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আ ন ম তানভীর চৌধুরী বলেন, ‘রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল উত্তরাঞ্চলের বড় একটি জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত। ১০০ শয্যার শিশু হাসপাতালটি প্রয়োজনীয় জনবল ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করে চালু করা গেলে রমেকের ওপর শিশুরোগীর চাপ অনেকটাই কমবে।’