রাজশাহীতে অনলাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ম্যাংগো লাভার’-এর কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় দুই কর্মচারী আহত হয়েছেন। পরে এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
তবে ঘটনাটির নেপথ্যে প্রতিষ্ঠানের এক কর্মচারীর পারিবারিক বিরোধ কাজ করেছে বলে জানা গেছে। এই ঘটনায় রাজশাহী জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও নওহাটা পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর মাসুদ পারভেজ শুভর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রতিষ্ঠানটির মালিক মুরাদ পারভেজ। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাসুদ পারভেজ।
গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা কলেজ মোড়ে ম্যাংগো লাভারের কার্যালয়ে এই ঘটনা ঘটে। প্রতিষ্ঠানটি একটি ভবনের চতুর্থ তলায় অবস্থিত। এর স্বত্বাধিকারী মুরাদ পারভেজের বাড়ি নওহাটা পৌর এলাকার পাইকপাড়া মহল্লায়।
জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী আশিকের সঙ্গে তাঁর বড় ভাই রাসেলের পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তাঁদের বাড়ি নওহাটা পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বড়ইকুঁড়ি এলাকায়। বিষয়টি মীমাংসার জন্য সেখানে যান প্রতিবেশী মাসুদ পারভেজ শুভ। অভিযোগ রয়েছে, ওই ঘটনার জের ধরেই পরে আশিক তাঁর লোকজন নিয়ে ম্যাংগো লাভারের কার্যালয়ে যান।
এ বিষয়ে মাসুদ পারভেজ শুভ বলেন, কলেজ মোড় এলাকায় দুই পক্ষের লোকজন পুনরায় জড়ো হওয়ার খবর পেয়ে তিনি সেখানে যান। ভবনের নিচতলায় ওয়ালটনের একটি বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। দ্বিতীয় তলা ফাঁকা এবং তৃতীয় তলায় ভবনের মালিক ও ওয়ালটন বিক্রয়কেন্দ্রের স্বত্বাধিকারী আলী ইমাম জুয়েল বসবাস করেন।
মাসুদ পারভেজের দাবি, তিনি ভবনের নিচের গেটে অবস্থান করে লোকজনকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি কাউকে ওপরে উঠতে দেননি এবং নিজেও ওপরে যাননি। ঘটনাস্থলে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করলেই তাঁর বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যাবে বলে তিনি দাবি করেন।
তবে ভবনের নৈশপ্রহরী কাজী হাতেম (৩২) ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি জানান, ঘটনার সময় ৩০ থেকে ৩৫ জন ভবনের ওপরে উঠে হামলা ও মারধর চালায়। তাদের মধ্যে তিনি মাসুদ পারভেজ শুভকেও দেখেছেন বলে দাবি করেন।
হামলায় প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মচারী সাকিব (২৪) ও তানিম (২৮) আহত হন। তাঁদের বাড়ি পবা উপজেলার বায়া এলাকায়। রাতেই তাঁদের উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কে বিশ্বাস বলেন, আহত সাকিবের বাঁ হাঁটুতে ফোলা রয়েছে এবং তিনি ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আছেন। তানিমের মুখের বাঁ পাশে ফোলা ও মাথায় হালকা আঘাত রয়েছে। তিনি ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি আছেন। দুজনের কারও আঘাত গুরুতর নয় এবং তাঁরা শঙ্কামুক্ত। দ্রুতই তাঁদের হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তানিম বলেন, অফিস ছুটির সময় তিনি কার্যালয়ের সামনে অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ কয়েকজন দৌড়ে এসে তাঁকে ধরে ফেলেন। তাঁদের হাতে লাঠি, চাকুসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ছিল। হামলাকারীরা জোরপূর্বক ভবনের ওপরে উঠে যান। বাধা দিতে গেলে সিঁড়িতেই তাঁকে মারধর করা হয়। পরে তাঁরা অফিসে ঢুকে কম্পিউটার, সিসিটিভি ক্যামেরাসহ বিভিন্ন জিনিস ভাঙচুর করেন। মারধরের একপর্যায়ে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।
আজ শুক্রবার দুপুরে ম্যাংগো লাভারের স্বত্বাধিকারী মুরাদ পারভেজ অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা তাঁর প্রতিষ্ঠানের ক্যাশ বাক্স থেকে ১৫ লাখ ২০ হাজার টাকা লুট করে নিয়ে গেছেন। এ ছাড়া দুই থেকে আড়াই লাখ টাকার আসবাব নষ্ট করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ৩০ থেকে ৩৫ জন হামলাকারী কার্যালয়ে উঠে তাণ্ডব চালান এবং তাঁর দুই কর্মচারীকে গুরুতর আহত করেন। প্রাণ বাঁচাতে তিনি নিজে সরে গিয়ে আত্মরক্ষা করেন।
মুরাদ পারভেজ আরও বলেন, হামলাকারীদের ধস্তাধস্তির সময় তাঁর ব্যবহৃত তিনটি ল্যাপটপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, সাবেক ছাত্রদল নেতা ও সাবেক কাউন্সিলর মাসুদ পারভেজ শুভ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে এসব কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই ঘটনায় তিনি মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং এজাহারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করবেন বলে জানান।
আজ বিকেল পর্যন্ত এই ঘটনায় কোনো মামলা দায়ের হয়নি বলে জানা গেছে। তবে সকালেই সাংবাদিকদের সামনে ভাঙচুর হওয়া কার্যালয় দেখিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মুরাদ পারভেজ বলেন, অনলাইনে আম বিক্রি করেই তাঁর জীবিকা নির্বাহ হয়। হামলাকারীরা তাঁর প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক ক্ষতি করেছেন। তাঁর সেই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে ঘটনার পর রাত সাড়ে ১২টার দিকে পবা থানার টহল দলের উপপরিদর্শক (এসআই) আসিব নাসিব ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি জানান, সেখানে দুটি ল্যাপটপ তারের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা গেছে। একটি টি-টেবিল ভেঙে যাওয়ায় কাচের টুকরা ছড়িয়ে ছিল। তাঁর প্রাথমিক ধারণা, ধস্তাধস্তি ও মারামারির সময় এসব ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে ভাঙচুর চালানোর উদ্দেশ্যে হামলা হয়েছে বলে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর মনে হয়নি।
পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, ভবনের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে ভবনের মালিক জানিয়েছেন, প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে ক্যামেরার ফুটেজ সংরক্ষিত হয়নি।