সারা জীবন পদ্মা নদীর পাড়েই বাস করেছেন জাহেরা বেগম। নদীকে কেন্দ্র করেই তাঁদের জীবন-জীবিকা। সেই নদী পারি দিতে গিয়ে আগেই তিনবার মৃত্যুর মুখ থেকে ঘুরে এসেছেন জাহেরা। নৌকাডুবির পর প্রতিবারই সাঁতরে পাড়ে এসেছেন তিনি। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরেও জাহেরার স্বামী কাওসার আলীর নৌকা ডুবেছে। এবারও জাহেরা প্রাণে বেঁচেছেন, কিন্তু রক্ষা হয়নি তাঁর স্বামী কাওসার আলী (৬০) ও ছেলে জিয়ারুল ইসলামের (৩০)।
জাহেরার বাড়ি রাজশাহীর কাটাখালী থানার শ্যামপুর বালুঘাট এলাকায়। বাড়িটি পদ্মা নদীর তীররক্ষা বাঁধের সঙ্গেই। বাড়ির সামনে দিয়েই বয়ে গেছে পদ্মা। আগে তাঁদের বাড়ি ছিল নদীর ওপারে ভারতীয় সীমান্ত লাগোয়া চর খিদিরপুরে। সেই বাড়ি নদীতে বিলীন হলে তাঁরা এ পারে চলে আসেন বছর দশেক আগে। কিন্তু এখনো তাঁদের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে নদীর ওপর। এই নদীই গতকাল কেড়ে নিয়েছে জাহেরা বেগমের স্বামী-সন্তানকে।
পানের বরজে ঝাউগাছের খুব কদর। তাই ওই এলাকার নদীপারের মানুষ পদ্মার চর থেকে ঝাউগাছ কেটে এনে চারঘাটের টাঙনে বিক্রি করেন। জাহেরার স্বামী কাওসার আলী ঋণ করে একটি নৌকা করেছিলেন। এ নৌকায় পাড়ার কয়েকজনকে নিয়ে ঝাউগাছ কাটতে যেতেন। তাঁদের সঙ্গে যেতেন কাওসারের স্ত্রী জাহেরা বেগম ও ছেলে জিয়ারুল ইসলামও।
এলোমেলো বাতাসে গতকাল দুপুরে নদী ছিল উত্তাল। ঝাউগাছ নিয়ে আসার পথে নৌকার নিয়ন্ত্রণ হারান কাওসার আলী। রাজশাহীর বড়কুঠির সামনে মাঝনদীতে নৌকাটি ডুবে যায়। এ সময় জাহেরা বেগমসহ নৌকার ছয় যাত্রী নদীতে সাঁতার কাটতে থাকেন। অন্য একটি নৌকা গিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে। কিন্তু পানিতে তলিয়ে যান মাঝি কাওসার আর তাঁর ছেলে জিয়ারুল। আজ দুপুর পর্যন্ত তাঁদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
আজ সকালে জাহেরা বেগমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, জিয়ারুলের স্ত্রী সায়েরা খাতুনকে নিয়ে বসে আছেন স্বজনেরা। এক সঙ্গে বাবা আর দাদাকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েছে সায়েরার ছেলে তামিম (১১) ও মেয়ে তাসমিরা (৭)। কাঁদতে কাঁদতে সায়েরা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী চলে গেল, শ্বশুরও চলে গেল। উপার্জন করার কেউ থাকল না। আমরা এখন চলব কী করে? সরকার যেন আমাদের দিকে একটু সুনজর দেয়। আমরা বাঁচতে চাই।’
সায়েরার আকুতি, যেন তাঁর স্বামী-শ্বশুরের মরদেহটি অন্তত উদ্ধার করে দেওয়া হয়। শেষবারের মতো একনজর স্বামীর মুখ দেখে গোসল করিয়ে তাঁকে কবরস্থ করতে চান তাঁরা।
স্বামী-সন্তানকে চোখের সামনে ভেসে যেতে দেখেছেন জাহেরা বেগম। তারপর থেকেই আহাজারি করছেন তিনি। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর গলা বসে গেছে। তবুও কান্না থামছে না। বাঁধের ওপর বসে নদীর দিকে তাকিয়েই চোখের পানি ফেলছেন। জাহেরা জানান, ৫৫ বছরের জীবনে তিনি এর আগেও তিনবার নৌকাডুবিতে পড়েছিলেন। সাঁতার জানেন বলে বেঁচে ফিরেছেন। এবারও নৌকা ডুবে গেলে তিনি সাঁতার কাটছিলেন। তাঁর চোখের সামনেই স্বামী-সন্তান ডুবে গেছেন।
জাহেরা বেগম বলেন, ‘অ্যার আগেও আমি তিনবার নৌকায় ডুব্যাছি। পটলের নৌকায় একবার ডুবে মরতে মরতে বাঁইচাছি। আমিই বাঁচা গেনু, আমার স্বামী আর ব্যাটাকে হারানু।’
জাহেরা বেগম আরও জানান, বছরখানেক আগেই একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা কিস্তি নিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকা বানিয়েছিলেন তাঁর স্বামী। এখন প্রতি সপ্তাহে আড়াই হাজার টাকা কিস্তি লাগে। ডুবে গিয়ে নৌকা ভেসে গেছে। ভেসে গেছেন স্বামী-সন্তানও। তিনি এখন কীভাবে কিস্তি পরিশোধ করবেন, কীভাবে সংসার চলবে তা ভেবে কূল-কিনারা পাচ্ছেন না।
জাহেরা বেগম নদীপারে বসেই বার বার দুই হাত তুলছেন। দ্রুতই যেন তাঁর স্বামী-সন্তানের লাশ পাওয়া যায়, সেই দোয়া করছেন। বলছেন, ‘গাঙে ক্যানে আমাক নিল না? আমাক রাইখে ক্যান আমার স্বামী-ব্যাটাক নিল? ছেইলির বউকে লিয়ি আমার সংসার এখন চইলবে কী কইরি?’
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের রাজশাহী সদর স্টেশনের উপপরিচালক মনজিল হক বলেন, ‘রাজশাহী থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্টে নজর রাখা হচ্ছে। আমাদের লোকজনও আছে। কোথাও লাশ ভেসে উঠলেই দ্রুত সময়ের মধ্যে উদ্ধার করে পরিবারকে দেওয়া হবে।’