সারাক্ষণ মাছি ভন ভন করছে। এ জন্য শিশুকে ঘুম পাড়াতে হচ্ছে মশারির নিচে। তা না হলে শিশুর ঘুম হচ্ছে না। খেতে বসলে মাছি এসে বসছে খাবারের ওপর। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামজুড়ে এখন মাছির এমনই উৎপাত। আর এই মাছির উৎস গ্রামের একটি মুরগির খামার। সেখান থেকে ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধও। গ্রামবাসী বলছেন, খামারের দুর্গন্ধ আর মাছির যন্ত্রণায় এখন মেয়ে-জামাই তাঁদের বাড়ি বেড়াতে আসছেন না।
গ্রামবাসীর অভিযোগের ভিত্তিতে গত মে মাসে তদন্ত করে উপজেলা প্রশাসন। এতে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। আইনি ব্যবস্থা নিতে তদন্ত প্রতিবেদন পরিবেশ অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাই খামারের দুর্গন্ধ ও মাছির উপদ্রবে বিপর্যস্ত রয়েছে স্থানীয় জনজীবন। খামারে দীর্ঘদিন ধরে মুরগির বিষ্ঠা জমিয়ে রাখা এবং দুর্গন্ধনাশক ব্যবহার না করায় গ্রামে এখন টেকা মুশকিল হয়ে পড়েছে।
গোদাগাড়ীর দেওপাড়া ইউনিয়নের এই গ্রামের খামারটির মালিকের নাম মো. স্বপন। গতকাল মঙ্গলবার খামারটিতে গিয়ে দেখা যায়, জমে থাকা মুরগির বিষ্ঠার স্তূপ থেকে ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। খামারের ভেতর ও আশপাশে উড়ছে অসংখ্য মাছি। এসব মাছি উড়ে যাচ্ছে গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে। গ্রামবাসী বলছেন, মাছির উপদ্রবে খাবার সংরক্ষণ, রান্নাবান্না কিংবা স্বাভাবিকভাবে খাওয়াদাওয়া করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। মাছির কাছে তাঁরা অসহায় হয়ে পড়েছেন। এ গ্রামে ১২০টি পরিবার রয়েছে। বাস করেন ৬৪২ জন মানুষ। তিন মাস ধরে খামার থেকে দুর্গন্ধ ও মাছির উপদ্রব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলে গ্রামের লোকজন জানান।
গ্রামের বাসিন্দা রোহেনা বেগম বলেন, ‘তরকারি রান্না করে রাখার উপায় নেই। খাবার পরিবেশন করলেই ভাতের প্লেট-তরকারিতে মাছি এসে পড়ে। কিছুদিন আগে মেয়ে-জামাই এসেছে। তাদের খেতে দিয়েছি। প্লেটে চারটা-পাঁচটা করে মাছি এসে বসছে। এই দেখে জামাই খেতেই পারল না। আমার চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে গেল। এখন মেয়ে-জামাই আসেই না।’
তিনি জানান, আগে খামারটিতে সোনালি জাতের মুরগি পালন করা হতো। তখন এখনকার মতো মাছির উপদ্রব ছিল না। এখন ভয়াবহ সমস্যা। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে বসবাস করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত প্রতিকার না পেলে আদালতের আশ্রয় নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
সম্প্রতি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দেওয়া গৃহিণী লিপি খাতুন বলেন, ‘ছোট বাচ্চার শরীর ও মুখে সব সময় মাছি বসে থাকে। বাধ্য হয়ে সারাক্ষণ মশারি টাঙিয়ে রাখতে হচ্ছে। ঘরে কোনো খাবার রাখলেই মাছি ভিড় করে। বাচ্চাকে নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় আছি।’
গ্রামের আরেক বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘মাছির অত্যাচারে গত ছয় মাস ধরে আত্মীয়স্বজন বাড়িতে আসতে চান না। খাবারের ওপর মাছি বসে যাওয়ায় অস্বস্তির কারণে গ্রামের মেয়ে-জামাইও এখন আর শ্বশুরবাড়িতে আসেন না। রান্নাবান্না ও স্বাভাবিক খাওয়াদাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মাছি থেকে রোগবালাই ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।’
গ্রামের লোকজন জানান, প্রতিকার চেয়ে তাঁরা সম্প্রতি জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পরিবেশ অধিদপ্তরে একাধিকবার লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ করেছেন। অভিযোগের পর পরিবেশ অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও ভূমি কার্যালয়ের প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। উপজেলা প্রশাসন তদন্ত করেছে। কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি তদন্তের জন্য উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়েছিল। ১৯৬ পাতার তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, খামারে সৃষ্ট মুরগির বর্জ্যের দুর্গন্ধ গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পরিবেশদূষণ ঘটাচ্ছে এবং এতে স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি গবাদিপশুকে খাবার খাওয়ানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। খামারে নিয়মিত দুর্গন্ধনাশক ব্যবহার না করায় পরিবেশদূষণ আরও বেড়েছে বলে তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মুরগির বাচ্চা ও ডিম উৎপাদনের সময় সৃষ্ট বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে রাখা হলেও পরিবেশ রক্ষায় সরকার অনুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। খামারের কার্যক্রম স্থানীয় জনজীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে কি না, তা যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিবেদনটি পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী কার্যালয়ের উপপরিচালক তাছমিনা খাতুন বলেন, ‘গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদন আমরা পেয়েছি। ইতিমধ্যে খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত অনুমোদনের বিষয়গুলো যাচাই করা হয়েছে। সেখানে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই খামারমালিকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত খামারের জমে থাকা বর্জ্য অপসারণ, মাছি ও দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে এলাকায় রোগবালাই ছড়িয়ে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা। অভিযোগের বিষয়ে খামারমালিক মো. স্বপনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।