রাজশাহীর গোধুলি মার্কেটে এক যুবলীগ নেতা ও প্রভাবশালী এক ব্যবসায়ীর দখলদারির বিষয়ে নড়েচড়ে বসেছে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ)। অতিরিক্ত দখল ও অনুমোদন ছাড়াই নকশা পরিবর্তনের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি এবং বকেয়া ভাড়া পরিশোধ করতে তাঁদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দখল, নকশা পরিবর্তন ও ভাড়া বকেয়া রাখায় কেন দুজনের বরাদ্দ বাতিল করা হবে না—সে বিষয়ে তাঁদের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
আরডিএর এস্টেট অফিসার মো. বদরুজ্জামানের সই করা পৃথক চিঠিতে এসব নির্দেশ দেওয়া হয়। আজ শনিবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আরডিএ চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ সুইট। আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার অংশ হিসেবে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
জানা গেছে, ২০০৭-০৮ সালে চারতলা গোধুলি মার্কেটটি নগরীর শিরোইল বাস টার্মিনাল এলাকায় নির্মিত হয়। ২০০৮ সালেই দোকান বরাদ্দ শুরু হয়। দোতলায় ১৫৭টি দোকান ছিল। এর মধ্যে ৪৬টি দোকান মিলে ৫ হাজার ৬১২ বর্গফুট জায়গা ভাড়া নেন ব্যবসায়ী শফিকুল আউয়াল খান। পরে তিনি আরও ১ হাজার বর্গফুট জায়গা ভাড়া নেন। আরডিএর শতাধিক দোকানের ভাড়াটিয়ার কাছ থেকেও তিনি দোকানগুলো নেন। পরে সব দোকান ভেঙে বানানো হয় বিশাল এক ফার্নিচারের শোরুম। এ জন্য প্যাসেজ ও ক্যান্ডিলিভারের জায়গাও দখল করেছেন আউয়াল। এখন ১৫৭টি দোকানের কোনো অস্তিত্ব নেই। শফিকুল ভবনের চারতলায় ৪ হাজার ৫২৪ বর্গফুট জায়গাজুড়ে আলিশান এক ফ্ল্যাট বানিয়ে সপরিবারে বাস করছেন। চারতলায় আরও ৪ হাজার ৫৯০ বর্গফুট জায়গা দখল করে বানিয়েছেন একটি ফার্নিচারের গুদাম।
এ ছাড়া ওই ভবনে রাজশাহী মহানগর যুবলীগের সাবেক সভাপতি রমজান আলীরও দখলদারি আছে। এ নিয়ে গতকাল শুক্রবার আজকের পত্রিকায় ‘রাজশাহী: আরডিএর মার্কেট গিলেছেন তিনি’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ হয়।
আরডিএর চিঠিতে বলা হয়েছে, শফিকুল আউয়ালের বরাদ্দপ্রাপ্ত ৪৬টি দোকান ও দ্বিতীয় তলার বাণিজ্যিক স্পেস মিলিয়ে মোট ৬ হাজার ৬১২ বর্গফুট জায়গার বিপরীতে শফিকুলের কাছে ২৬ লাখ ১৯ হাজার ২৫ টাকা বকেয়া ভাড়া রয়েছে। একাধিকবার নোটিশ দেওয়ার পরও তিনি নির্ধারিত ভাড়া পরিশোধ করেননি।
এ ছাড়া শফিকুল আউয়াল কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া বরাদ্দের অতিরিক্ত ৫ হাজার ৭৬৯ বর্গফুট প্যাসেজ ও বারান্দা ব্যবহার করছেন। এ অবৈধ ব্যবহারের জন্য ৬০ লাখ ৭ হাজার ৮৪২ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি চতুর্থ তলায় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও বরাদ্দপত্র ছাড়া ৪ হাজার ৫২৪ বর্গফুট জায়গা আবাসিক হিসেবে এবং ৪ হাজার ৫৯০ বর্গফুট জায়গা গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছেন। এখানকার ৯ হাজার ১১৪ বর্গফুট বাণিজ্যিক স্পেসের এ ধরনের ব্যবহারের জন্য ৫০ লাখ ১২ হাজার ১৬৪ টাকা ক্ষতিপূরণ বা জরিমানা দাবি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে তাঁর কাছে আরডিএর পাওনা ১ কোটি ৩৬ লাখ ৩৯ হাজার ৩১ টাকা।
অপর দিকে যুবলীগ নেতা রমজান আলীকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, ভবনের দ্বিতীয় তলায় ১৫ থেকে ২৩ নম্বর পর্যন্ত ৯টি দোকানের ১ হাজার ৪৪০ বর্গফুট বাণিজ্যিক স্পেস বরাদ্দ নিয়ে রমজান নির্ধারিত ভাড়া পরিশোধ করেননি। তাঁর কাছে ৫ লাখ ১১ হাজার ২৩০ টাকা বকেয়া রয়েছে। তিনিও অনুমোদন, বরাদ্দপত্র ও চুক্তিপত্র ছাড়াই তৃতীয় তলায় ১ হাজার ৭৭৪ বর্গফুট এবং চতুর্থ তলায় ১ হাজার ৭৭ বর্গফুট বাণিজ্যিক স্পেস অবৈধভাবে দখল করে ব্যবসা করছেন। এসব অবৈধ ব্যবহারের জন্য ক্ষতিপূরণ ও জরিমানা হিসেবে দাবি করা হয়েছে ১৮ লাখ ৩১ হাজার ৪২১ টাকা। বকেয়া ভাড়া ও ক্ষতিপূরণ মিলিয়ে রমজান আলীর কাছে আরডিএর মোট পাওনা ২৩ লাখ ৪২ হাজার ৬৫১ টাকা।
চিঠিতে রমজান আলী ও শফিকুল আউয়াল খানকে অবৈধভাবে ব্যবহৃত জায়গা খালি করে আরডিএর দখলে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশ পাওয়ার সাত কার্যদিবসের মধ্যে তাঁদের বকেয়া ভাড়া ও ক্ষতিপূরণ পরিশোধ এবং অবৈধ ব্যবহার বন্ধ করে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তা না হলে বরাদ্দ ও চুক্তি বাতিল, দখল গ্রহণ, স্পেস সিলগালা, বকেয়া অর্থ ও ক্ষতিপূরণ আদায়সহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে ব্যবসায়ী শফিকুল আউয়াল খানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। অন্যদিকে গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে যুবলীগ নেতা রমজান আলী আত্মগোপনে থাকায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।