হোম > সারা দেশ > রাজশাহী

প্রত্যয়ন জালিয়াতি: ভেলকি দেখাচ্ছেন মাদক কারবারি আজাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী

আবুল কালাম আজাদ। ছবি: সংগৃহীত

করেন মাদকের কারবার। এ কারণে মামলা আছে সাতটি। আবার এলাকায় মাদক কারবার চালিয়ে যেতে প্রভাব ধরে রাখতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সখ্যও ছিল। সক্রিয়ভাবে যুবলীগের কর্মসূচিতে অংশ নিতেন। জুলাই আন্দোলনের সময় করা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তবে এই মামলা থেকে জামিন পেতে বিএনপির কর্মী—এমন একটি প্রত্যয়নপত্র আদালতে দাখিল করেছেন তিনি। আদালত তাঁর জামিনও মঞ্জুর করেছেন।

সম্প্রতি এমন ঘটনা ঘটেছে রাজশাহীতে। এই আসামির নাম আবুল কালাম আজাদ। জেলার গোদাগাড়ী পৌরসভার মহিষালবাড়ী মহল্লার বাসিন্দা তিনি। এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর তাঁকে আবার গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী জেলার নেতারা।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কালাম দীর্ঘ দুই যুগের বেশি সময় ধরে হেরোইন কারবারে জড়িত। তাঁর বিরুদ্ধে মাদক আইনে সাতটি মামলা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে একটি মামলায় তাঁর যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডও হয়েছিল। পরে জামিনে বের হয়ে আবারও অবৈধ মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন তিনি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এলাকার তৎকালীন সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ছিলেন আবুল কালাম আজাদ।

পুলিশ বলছে, আবুল কালাম আজাদ আগে সক্রিয়ভাবে যুবলীগের কর্মসূচিতে অংশ নিতেন। সরকার পতনের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করতে অর্থের জোগান দিচ্ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অনেকটা আত্মগোপনে থাকলেও সম্প্রতি তিনি প্রকাশ্যে আসেন। গত ২০ জুলাই পুলিশ তাঁর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে।

এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গোদাগাড়ীতে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে সেদিনই তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। গত ১২ আগস্ট রাজশাহী জেলা ও দায়রা জজ আদালতে তাঁর জামিনের আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালত তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন। পরে জেল থেকে বের হন তিনি।

প্রত্যয়নপত্র জালিয়াতি

নথিপত্রে দেখা গেছে, আবুল কালাম আজাদের আইনজীবী তৌসিক আহমেদ মাসুম আসামির জামিন পেতে আদালতে দুটি প্রত্যয়নপত্র জমা দিয়েছেন। একটিতে সিল ও স্বাক্ষর রয়েছে গোদাগাড়ী পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র আনোয়ারুল ইসলামের। অপরটিতে স্বাক্ষর রয়েছে পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হানিফ আলীর।

দুটি প্রত্যয়নপত্রেই লেখা রয়েছে, ‘আবুল কালাম আজাদ বিএনপির একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে দলীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত আছেন। দলের গঠনতন্ত্র ও শৃঙ্খলা মেনে চলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা প্রশংসনীয়।’ এ ছাড়া শীর্ষ এই মাদক কারবারির ব্যাপারে প্রত্যয়নপত্রটিতে আরও লেখা হয়েছে, ‘তিনি কোনো প্রকার রাষ্ট্রবিরোধী বা অসামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত নন।...’

তবে পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘আমি স্বাক্ষরে লিখি আ ইসলাম। এই স্বাক্ষর আমার না। সিলও নকল করা হয়েছে। আমি প্রত্যয়নপত্র দিইনি। এটা জাল। এ রকম জালিয়াতির ব্যাপারে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। আমি জিডি করব।’

তবে শুধু প্রতিবেশী বলে প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হানিফ আলী। তিনি বলেন, ‘কালামের স্ত্রী ঘুরছিল। তারা আমার প্রতিবেশী। সে হিসেবে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছি। এটা ভুল হয়ে গেছে। এখন দেখি কী করা যায়।’

আনোয়ারুলের জাল প্রত্যয়নপত্র আদালতে জমা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে কালামের আইনজীবী তৌসিক আহমেদ বলেন, ‘আসামির আত্মীয়স্বজন এগুলো এনে দিয়েছে। আমি সত্যায়ন করে আদালতে জমা দিয়েছি। সঠিক না জাল, সেটা তো বলতে পারব না।’

আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘প্রত্যয়নটা কোনোভাবে হয়েছে আরকি। যেকোনোভাবে হয়ে আছে। তবে আমি সঠিক বলতে পারব না।’ এরপরই তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

জেলা ও দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী রইসুল ইসলাম বলেন, ‘জাল প্রত্যয়নপত্র জমা দেওয়া আদালতের সঙ্গে প্রতারণা। এটা আরও বড় অপরাধ। জেল থেকে বের হওয়ার আগেও আমরা জানতে পারলে ব্যবস্থা নিতাম। আগামী ধার্য তারিখে বিষয়টি দেখতে হবে।’

আবেদন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে

এদিকে বিএনপির একাধিক নেতা জানান, জুলাই মামলায় কারাগার থেকে বের হতে বিএনপির একাধিক নেতার কাছে গিয়েছিলেন মাদক কারবারি আবুল কালাম আজাদের স্ত্রী আরমিনা আক্তার বাবলি।

গোদাগাড়ী পৌর বিএনপির সভাপতি মজিবুর রহমান বলেন, ‘আমার কাছে প্রত্যয়ন নিতে এসেছিল। তাঁর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে যা শুনেছি, তাতে আমি প্রত্যয়ন দিতে পারি না।’ সাধারণ সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘আমাকেও বলেছিল। আমি জানি না যে সে বিএনপি করে। এ জন্য প্রত্যয়ন দিইনি। সে মাদক কারবারি বলে শুনেছি। অনেক কথা রাজনীতি করার স্বার্থে বলাও যায় না।’

সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রত্যয়নের জন্য আমার কাছে এসেছিল। সে আসলে বিএনপি করেনি। সে মাদকের সঙ্গে জড়িত। আমি প্রত্যয়ন দিইনি।’

স্থানীয় নেতাদের কাছ থেকে প্রত্যয়ন না পেয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরেও একটি লিখিত আবেদন পাঠিয়েছেন আবুল কালাম আজাদ। নিজেকে একজন ব্যবসায়ী ও আমদানিকারক উল্লেখ করে এতে তিনি লিখেছেন, জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী হওয়ায় গত ১৭ বছরে তিনি বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন। আবেদনে কালাম দাবি করেন, তিনি প্রতিবছর সরকারকে ২৫ থেকে ৩৫ লাখ টাকা ভ্যাট ও আয়কর পরিশোধ করে থাকেন।

আবার গ্রেপ্তারের দাবি

প্রত্যয়নপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে জামিন নেওয়ায় আবুল কালাম আজাদকে আবার গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী জেলার আহ্বায়ক নাহিদুল ইসলাম সাজু। তিনি বলেন, ‘কালাম একজন নেতার প্রত্যয়ন জালিয়াতি করেছেন। আবার আরেকজন সত্যিই প্রত্যয়ন দিয়েছেন। যিনি প্রত্যয়ন দিয়েছেন, তিনি জুলাইয়ের শহীদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করেছেন। আমরা দাবি জানাচ্ছি, দ্রুতই যেন তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়।’

জানতে চাইলে গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুজন মিঞা বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় যুক্ত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কে প্রত্যয়ন দিয়েছেন বা না দিয়েছেন, সে বিষয়ে কিছু জানেন না। কোনো অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পেলে তাঁকে অবশ্যই গ্রেপ্তার করা হবে।