রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় তিন ছাত্রদল নেতা ও এক হল সংসদ নেতার ছাত্রত্ব সাময়িকভাবে বাতিলের সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। এ ছাড়া আরও চারজনের বিরুদ্ধে অধিকতর তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া এবং তিনজনকে সতর্ক করার সুপারিশ করা হয়েছে। এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট।
আজ শুক্রবার (৯ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম।
ছাত্রত্ব সাময়িক বাতিলের সুপারিশ করা ব্যক্তিরা হলেন আইন বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবীব, ইতিহাস বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম, অর্থনীতি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা বিশাল চক্রবর্তী এবং জিয়াউর রহমান হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) আরিফুল ইসলাম।
এ ছাড়া ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলের সহসভাপতি তাকবীর আহমেদ ইমন, ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলের সহসাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজহারুল ইসলাম এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল কর্মী তানিম রহমানের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ ও তথ্য-প্রমাণ অধিকতর তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ঘটনার ইন্ধনদাতা হিসেবে অভিযোগ ওঠায় রাবি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সহ-সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক রাকিবুল ইসলামের বিরুদ্ধে অধিকতর তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি। এ ছাড়া শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি বুলবুল রহমান, শরীফুল ইসলাম ও সহদপ্তর সম্পাদক শাহরিয়ার আলমকে সতর্ক করার সুপারিশ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘তদন্ত কমিটি ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সেখানে তারা তিনটি সুপারিশ করেছে। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে আরও তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। অধিকতর তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে।’
আরিফুল ইসলাম ও রাকিবুল ইসলামের বিরুদ্ধে সুপারিশের বিষয়ে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক রেজাউল করিম-২ বলেন, ‘তাঁরা সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পেছনে উসকানিদাতা হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন।’ তিনি বলেন, ‘আরিফুল ইসলামের বিষয়ে আমাদের কাছে যেসব তথ্য-প্রমাণ ছিল, সেগুলোর ভিত্তিতেই তাঁর ছাত্রত্ব বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে।’
এর আগে গত শনিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবীব ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে রাকসুর জিএস আম্মারকে খুনি, ধর্ষক, চাঁদাবাজ, মববাজ, নিয়োগ-বাণিজ্যকারী ও অর্থ আত্মসাৎকারী আখ্যা দিয়ে একটি পোস্ট দেন।
ওই পোস্টে রাকসুর সহ-সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম মন্তব্য করে লেখেন, ‘কার খুনের আসামি করলি? ক্লিয়ার কর। এগুলো ছাত্রলীগের বয়ান।’
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরে দুজনের মধ্যে মেসেঞ্জারে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য চলে। একপর্যায়ে আহসান হাবীব রাকিবুলের সঙ্গে দেখা করতে চান। রাকিবুল জানান, তিনি বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত পরিবহন মার্কেটে থাকবেন। একা থাকার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, কেউ পারলে যেন তাঁর গায়ে হাত দিয়ে দেখায়।
রাকিবুল সেখান থেকে চলে যাওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর সন্ধ্যা ছয়টার দিকে আহসান হাবীব দলবল নিয়ে পরিবহন মার্কেট এলাকায় যান বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের হাতে হকিস্টিক ছিল।
এদিকে, এ ঘটনার মধ্যে জিয়াউর রহমান হল সংসদের জিএস আরিফুল ইসলাম তারেক রহমানকে কেন্দ্র করে একটি কটূক্তিমূলক পোস্ট দেন বলে অভিযোগ ওঠে। ওই পোস্টের পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা জিয়াউর রহমান হলে আরিফুল ইসলামকে মারতে যান। তাঁকে না পেয়ে তাঁর কক্ষে ভাঙচুর চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরে এ ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে গেলে সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে দ্য ডেইলি স্টারের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি নূর আহসান মৃদুল, দৈনিক সমকালের মাঈনুল ইসলাম রাজু, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আরিফ-উজ-জামান কোরবান এবং আগামীর সময়ের জাহিদুল ইসলাম আহত হন।
এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিকেরা তিন দফা দাবি জানান। পরে তাঁদের দাবির প্রেক্ষিতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।