খেলার মাঠজুড়ে সারি সারি কলাগাছ। প্রধান ফটকে বাঁশের বেড়া। শিক্ষকদের কার্যালয়ের দরজায় ঝুলছে দুটি তালা। আজ শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে রাজশাহীর পুঠিয়ার ভালুকগাছি মুক্তিযোদ্ধা বিদ্যালয়ের চিত্র ছিল এমনই। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, জমি দখলের চেষ্টা হিসেবে এসব করেছেন প্রতিষ্ঠানটির দাতা সদস্য আজাদ আলী। তবে এ ঘটনার পেছনে আজাদের সঙ্গে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের বিরোধকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, বেলা ১১টার দিকে লোকজন নিয়ে এসে শিক্ষকদের কার্যালয়ের আগের তালার ওপর আরেকটি তালা লাগান আজাদ আলী। এরপর প্রধান ফটকে বাঁশের বেড়া দিয়ে মাঠে কলাগাছ লাগিয়ে দেন।
পুঠিয়ার ভালুকগাছি গ্রামে ২০১৫ সালে ‘মুক্তিযোদ্ধা টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ নামে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে। প্রাক্-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পাঠদানের পরিকল্পনা ছিল। প্রাথমিক পর্যায়ের জন্য রাজশাহী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় এবং মাধ্যমিক পর্যায়ের জন্য রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের অনুমতি রয়েছে।
২০২৪ সালে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তনের বিষয়ে চিঠি দেয়। এরপর ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় ‘ভালুকগাছি মুক্তিযোদ্ধা স্কুল’ নাম নির্ধারণ করা হয়। নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবদাতা হিসেবে রেজল্যুশনে আজাদ আলীর নাম রয়েছে। একই বছরের ১১ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটি পাঠদানের অনুমতি পায়। বর্তমানে প্রাথমিকের পাশাপাশি ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে পাঠদান চলছে। পর্যায়ক্রমে অষ্টম থেকে দশম শ্রেণি এবং পরে উচ্চমাধ্যমিক চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
আজাদ আলীর দাবি, টেকনিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে তিনি জমি দিয়েছিলেন। তাঁর ছেলে ও ছেলের বউকে চাকরি দেওয়ার কথাও ছিল। কিন্তু ওই নামে প্রতিষ্ঠান হয়নি এবং তাঁর ছেলের বউকেও চাকরি দেওয়া হয়নি। এ কারণে তিনি বিদ্যালয়ে তালা দিয়েছেন ও মাঠে কলাগাছ লাগিয়েছেন। তাঁর দাবি, বিদ্যালয়ের কার্যক্রমও ঠিকমতো চলে না।
তবে প্রধান শিক্ষক সেলিম রেজা বলেন, আজাদ আলী শুরুতে নিঃশর্তভাবে জমি দান করেছিলেন এবং ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা দিয়েছিলেন। স্থাপনা নির্মাণের পর প্রতিষ্ঠানের নামে জমি রেজিস্ট্রি করার সময় তিনি ছেলে ও ছেলের বউয়ের চাকরির দাবি করেন।
সেলিম রেজার দাবি, পরে কমিটি তাঁর পরিবারের সদস্যদের চাকরির বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে সম্মতি দেয়। আজাদ আলীর ছেলের বউকে প্রাথমিক শাখায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগও দেওয়া হয়েছিল। চাকরিরত অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর তাঁর ছেলে দ্বিতীয় বিয়ে করলে নতুন বউকে মাধ্যমিক শাখায় কেরানি পদে এবং ছেলেকে একটি পদে নিয়োগের প্রস্তাবেও কমিটি সম্মতি দেয়। এসব বিষয়ে রেজল্যুশন রয়েছে বলে দাবি করেন প্রধান শিক্ষক।
এদিকে ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আজাদ আলী রাজশাহীর আদালতে মামলা করেন। তাঁর অভিযোগ, যে নামে প্রতিষ্ঠান করার জন্য তিনি জমি দিয়েছিলেন, সেই নামে প্রতিষ্ঠান করা হয়নি। মামলাটি বর্তমানে চলমান।
স্থানীয় দোকানি লাল মোহাম্মদ জানান, প্রতিষ্ঠানটি চালুর সময় থেকেই তিনি সেখানে দোকান করছেন। একসময় অনেক শিক্ষার্থী থাকলেও মামলা ও বিরোধের কারণে এখন শিক্ষার্থী কমেছে। তবে পাঠদান চলছে। আজ শনিবারের ঘটনার পর বিদ্যালয়ের নলকূপের পানিও ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও ভালুকগাছি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান একদিনে দাঁড়ায় না। দাতা সদস্যের দাবি সঠিক নয়। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে এবং নিয়মিত পাঠদান চলছে। গত মাসের ১০ তারিখে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড নতুন ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদন দিয়েছে।