চিঠিটা খুব ছোট। অথচ তার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল কঠিন সত্য কথাগুলো। মেয়েটি তা মুখে বলতে পারেনি। তাই কলেজে গিয়েই ছেলেটির হাতে নিঃশব্দে ধরিয়ে দিয়েছিল চিঠিটা। তাতে লেখা ছিল, তাদের সম্পর্ক কোনোভাবেই মেনে নেবে না মেয়েটির পরিবার।
এই চিঠিই দুজনের সামনে খুলে দিয়েছিল অজানা এক পথের দরজা। দুপুর পর্যন্ত ভাবনা, তারপর সিদ্ধান্ত। কলেজের পোশাক পরেই দুজন বেরিয়ে পড়ে। কোথায় যাবে, কী করবে—সবকিছু পুরোপুরি পরিকল্পিত ছিল না। শুধু একটা সিদ্ধান্ত ছিল—একসঙ্গে থাকতে হবে।
গন্তব্য ঠিক হয় জয়পুরহাট। সেখানে ছেলেটির এক দাদার বাড়ি। সেখানে গিয়ে বিয়ে করার কথাও ছিল তাদের। কিন্তু স্বপ্নের সেই পথ থেমে গেল রেলস্টেশনে। ট্রেন থেকে নামতে মেয়েটি দুর্ঘটনার শিকার হয়। এতে তার একটি হাত ভেঙে যায়। মাথায় গুরুতর আঘাত পায়।
আজ সোমবার বিকেল ৫টায় পাবনার মাঝগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। তারা ছিল ঢাকা-চাঁপাইনবাবগঞ্জের বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী। দুর্ঘটনার পর মেয়েটিকে আবার সেই বনলতা এক্সপ্রেসেই রাজশাহী নিয়ে আসা হয়। রাত ৮টার দিকে তাকে ভর্তি করা হয় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের অর্থোপেডিকস সার্জারি বিভাগের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে।
এই বিপদের সময় পাশে দাঁড়িয়েছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাসিন্দা অনিক আলী। তিনিও বনলতা এক্সপ্রেসের যাত্রী ছিলেন। দুর্ঘটনার পর মেয়েটির সঙ্গে শুধু ছেলেটিকেই দেখতে পান। তাদের সঙ্গে আর কেউ নেই বুঝতে পেরে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন।
অনিক আলী জানান, ঢাকার কমলাপুরে গিয়ে ট্রেন চিনতে পারেনি দুজন। চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী বনলতা এক্সপ্রেসেই উঠে বসে। পাবনায় আসার পর তারা জানতে পারে, ট্রেনটি রাজশাহীর দিকে যাচ্ছে। তখনই সিদ্ধান্ত নেয়, নেমে যাবে। মাঝগ্রাম স্টেশনে ট্রেন থামতেই ছেলেটি আগে নেমে যায়, এরপর মেয়েটি। কিন্তু তার পা প্ল্যাটফর্মে পড়ার আগেই ট্রেন চলতে শুরু করে।
এক মুহূর্তেই পরিস্থিতি বদলে যায়। মেয়েটি ট্রেন ও প্ল্যাটফর্মের মাঝামাঝি জায়গায় ঢুকে যায়। আর ঠিক তখনই ছেলেটি তার হাত ধরে ফেলে। আর একটুখানি দেরি হলেই হয়তো গল্পটি অন্য রকম হতো। ট্রেনের নিচেই পড়ে যেতে পারত মেয়েটি। কিন্তু ছেলেটির সতর্কতায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যায় সে। তবে বাঁচার সেই মুহূর্তটিও ছিল ভয়াবহ।
রাতে হাসপাতাল গিয়ে দেখা যায়, ট্রলিতে তখনো মেয়েটির পরনে কলেজের সাদা পোশাক। মাথায় ব্যান্ডেজ। হাত থেকে রক্ত ঝরছে। সেই রক্তে সাদা পোশাকের একাংশ লাল হয়ে গেছে। চারপাশে হাসপাতালের ব্যস্ততা। ভিড়ের মধ্যে কলেজের পোশাক পরিহিত ছেলেটি নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মোবাইলে একের পর এক কল আসছে। কী করবে, কোথায় যাবে—কিছুই যেন বুঝে উঠতে পারছে না।
চিকিৎসক মেয়েটির হাতের এক্স-রে এবং মাথার সিটি স্ক্যান করতে বলেছেন। হাসপাতালের ভেতরেই এসব পরীক্ষা করার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু তাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিতে রোগী ধরার দালালেরা বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। পরে হাসপাতালেই পরীক্ষা করার ব্যবস্থা রয়েছে জানানো হলে মেয়েটিকে সেখানে নেওয়া হয়।
মাঝগ্রাম থেকেই তাদের সঙ্গে করে রাজশাহী পর্যন্ত নিয়ে আসেন অনিক। তার কাছ থেকেই জানা যায়, কলেজ থেকে পালিয়ে বেরিয়েছিল দুজন।
ছেলেটির সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তার বাড়ি উত্তরাঞ্চলের একটি জেলায়। মেয়েটির বাড়ি দক্ষিণাঞ্চলে। দুজনের পরিবারই ঢাকায় থাকেন। একই কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ে তারা। কলেজেই তাদের প্রথম পরিচয়। সেই পরিচয় ধীরে ধীরে গড়িয়েছে ভালো লাগায়। তারপর মন দেওয়া-নেওয়া। কিন্তু সম্পর্কের কথা পরিবার জানার পরই শুরু হয় বিপত্তি। পরিবার তাদের এই সম্পর্ক মেনে নেবে না—কথাটি মুখে বলতে পারেনি মেয়েটি। তাই সকালে চিঠিতে লিখে দিয়েছিল সব কথা। তারপর দুজন বেরিয়ে পড়ে অজানা পথে।
জয়পুরহাটে গিয়ে বিয়ে করার স্বপ্ন ছিল তাদের। দাদার বাড়িতে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু জয়পুরহাটে পৌঁছানোর আগেই রেলস্টেশনে এসে থেমে যায় সেই স্বপ্ন।
রাতে আবার ছেলেটির সঙ্গে ফোনে কথা হয়। ততক্ষণে এক্স-রে ও সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট চিকিৎসক দেখেছেন। ছেলেটি জানায়, মেয়েটির বাঁ হাত ভেঙে গেছে। মাথায় গুরুতর আঘাত রয়েছে। রাজশাহীতে তাদের কেউ নেই। তাই ছেলেটির সিদ্ধান্ত, মেয়েটিকে নিয়ে আবার ঢাকায় ফিরবে।