হোম > সারা দেশ > রাজশাহী

আমন মৌসুমে রাজশাহীতে সারের সংকট, কৃষকের হাহাকার

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী

টাকা দিয়েও চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না কৃষক আমন মৌসুমে। ছবি: আজকের পত্রিকা

আমন মৌসুমে রাজশাহীতে সারের সংকট দেখা দেওয়ায় কৃষকেরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। এক ডিলারের দোকানে সার না পেয়ে অন্য ডিলারের কাছে ছুটতে হচ্ছে, দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর যে পরিমাণ সার মিলছে, তা নিতান্তই নগণ্য। কোথাও আবার চাহিদামতো সার না পেয়ে খালি হাতে ফিরছেন কৃষকেরা। সংকটের কারণে সরকারি দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

গোদাগাড়ীর দেওপাড়া ইউনিয়নের বিসিআইসি ডিলার নজরুল ইসলামের দোকানে গিয়ে কৃষকদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। কেউ এক ঘণ্টা, কেউ দুই ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছিলেন। দেওপাড়া গ্রামের কৃষক আল্লাম জানালেন, সকাল থেকে ভিড়, দুই ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন।

কাজীহাটা গ্রামের কৃষক বাবলু জানান, তিনি এবার ১০ বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন। নিজ এলাকার ডিলারের কাছে সার না পেয়ে ইউরিয়া কিনতে দেওপাড়ায় এসেছিলেন। কিন্তু তাঁকে মাত্র ২০ কেজি সার দেওয়ার কথা বলা হলে সার না নিয়েই বাড়ি ফিরে যান।

পবার ভিমের ডাইং গ্রামের কৃষক হারুন অর রশিদ ডিএপি কিনতে এসে পাননি। গোদাগাড়ীর কদমশহর গ্রামের কৃষক রাশিদুল ইসলাম বলেন, তাঁর এলাকার বিএডিসি ডিলার রেজাউল করিমের কাছে সার না থাকায় তিনি অন্য এলাকায় এসেছেন। তাঁর ক্ষোভ, ‘শুধু ইউরিয়া দিলে ধানের থোড়ই তো হবে না।’

একই এলাকার কৃষক আকবর আলী দুই বস্তা ইউরিয়া পেলেও এক বস্তা ডিএপি পাননি। তিনি বলেন, ‘নিজের টাকা দিয়ে সার কিনতে এসেও সার পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে মাঠে আবাদ করা কঠিন হয়ে পড়বে।’

ডিলার নজরুল ইসলাম দাবি করেন, কৃষকেরা অনেক সময় বেশি সার পাওয়ার জন্য জমির পরিমাণ বেশি দেখান। যাচাই করে যার যতটুকু প্রয়োজন, সে অনুযায়ী সার দেওয়া হচ্ছে। তাঁর কাছে থাকা ২০ মেট্রিক টন ডিএপি শেষ হয়ে গেছে বলেও জানান তিনি।

চারঘাটের ভায়ালক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের আকাশ এন্টারপ্রাইজে টিএসপি কিনতে কৃষকদের ভিড় দেখা গেছে। বাঁকড়া গ্রামের কৃষক শফিকুল ইসলাম এক বস্তার পরিবর্তে পেয়েছেন ২৫ কেজি। ফরিদপুর গ্রামের কৃষক সাইফুল ইসলাম দুই বিঘা কলা ও দুই বিঘা আমন ধানের জন্য দুই বস্তা টিএসপি চাইলেও তাঁকে দেওয়া হচ্ছিল মাত্র ১৫ কেজি।

টাকা দিয়েও চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না কৃষক আমন মৌসুমে। ছবি: আজকের পত্রিকা

আকাশ এন্টারপ্রাইজের এক কর্মচারী জানান, তাঁরা মোট ১০ মেট্রিক টন টিএসপি পেয়েছিলেন। অবশিষ্ট ছিল ২৯ বস্তা। সবাইকে চাহিদামতো দিলে অনেক কৃষকই খালি হাতে ফিরবেন, তাই অল্প অল্প করে সার দেওয়া হচ্ছে।

সারের সংকটের সুযোগে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। গোদাগাড়ীর রাজাবাড়ীহাটে মুলকিডাইং গ্রামের কৃষক মমিন শহিদুল ট্রেডার্স থেকে ৫০ কেজির এক বস্তা ডিএপি কেনেন ১ হাজার ৭৫০ টাকায়। অথচ সরকারি মূল্য ১ হাজার ৫০ টাকা। একই দোকানে ইউরিয়া বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা বস্তা, যার সরকারি মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা।

প্রতিষ্ঠানটির মালিক সাইদুর রহমান ৩৪ টাকা কেজি দরে ডিএপি বিক্রির কথা স্বীকার করেছেন। পাশের সাদ এন্টারপ্রাইজের কর্মচারী কবির হোসেন জানান, তাঁদের ডিএপির মান কিছুটা খারাপ হওয়ায় প্রতি বস্তা ১ হাজার ৬০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।

কৃষকদের অভিযোগ, যে এলাকায় যে সারের চাহিদা বেশি, সেখানে সেই সারই বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় সরকারি বরাদ্দ কম থাকায় সংকটকে কাজে লাগিয়ে দাম বাড়ানো হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আগস্ট মাসে রাজশাহীতে ইউরিয়ার বরাদ্দ ৭ হাজার ৫৭৪ মেট্রিক টন। এর মধ্যে পাওয়া গেছে ৪ হাজার ৭২৪ মেট্রিক টন। ডিএপির ২ হাজার ৬৪৭ মেট্রিক টন বরাদ্দের বিপরীতে পাওয়া গেছে ২ হাজার ১৮২ মেট্রিক টন। টিএসপির ১ হাজার ৫১১ মেট্রিক টনের বিপরীতে পাওয়া গেছে ১ হাজার ২৪০ মেট্রিক টন এবং এমওপির ১ হাজার ৭৬০ মেট্রিক টনের বিপরীতে পাওয়া গেছে ১ হাজার ৪৯৬ মেট্রিক টন।

কৃষি বিভাগের হিসাবে, রাজশাহীতে মোট আবাদি জমির পরিমাণ ১ লাখ ৮৫ হাজার ২৬২ হেক্টর। চলতি মৌসুমে আমন আবাদ হয়েছে ৮৩ হাজার ৬০০ হেক্টর। আমন ধানে বিঘাপ্রতি আদর্শ ডিএপি ব্যবহারের পরিমাণ প্রায় ১০ কেজি হলেও বর্তমান বরাদ্দে সেই চাহিদা পূরণ হচ্ছে না।

জেলায় প্রায় ১৭ হাজার ৭৭৪ হেক্টর পুকুর রয়েছে। মাছ চাষে ব্যবহৃত সারের জন্য আলাদা বরাদ্দ না থাকলেও প্রতি তিন মাসে ডিএপির চাহিদা রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৯৯১ দশমিক ৫ মেট্রিক টন। ফলে কৃষিজমির জন্য বরাদ্দের ওপরও চাপ বাড়ছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

কৃষি বিভাগ বলছে, টিএসপির পরিবর্তে ডিএপি ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। এতে টিএসপি শতভাগ এবং ইউরিয়া প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে। কিন্তু অনেক এলাকাতেই পরামর্শ দেওয়া সেই ডিএপিও পাওয়া যাচ্ছে না।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কিছুটা কম পাওয়া যায়। পুকুরে ব্যবহৃত সারের চাহিদাও আলাদা করে বরাদ্দের মধ্যে নেই। বেশি দামে সার বিক্রি বা অবৈধ মজুদের অভিযোগ পাওয়া গেলে অভিযান চালানো হচ্ছে।’

সার বাইরে বিক্রি ও অবৈধভাবে মজুদের অভিযোগে গত কয়েক দিনে পবা, পুঠিয়া, দুর্গাপুর ও চারঘাট উপজেলায় অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। পবা ও পুঠিয়ায় ৩০ হাজার টাকা করে, দুর্গাপুরে ২০ হাজার এবং চারঘাটে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

রাজশাহী জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, রাজশাহীতে পর্যাপ্ত সার রয়েছে। চাহিদার তুলনায় কম বরাদ্দের বিষয়টি তাঁর জানা নেই। কোথাও বেশি দামে সার বিক্রি বা পাচারের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মাঠে কোথাও সার পাওয়া যাচ্ছে না—এমন তথ্য জানালে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।