রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানায় মাদক কারবারিদের তালিকার দুই নম্বরে নাম থাকা জাহাঙ্গীর আলম হেরোইন ও অস্ত্রসহ একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। সেই জাহাঙ্গীর গত মঙ্গলবার অংশ নেন গোদাগাড়ী উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত মাদকবিরোধী কমিউনিটি পুলিশিং সভায়। এতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন স্থানীয়রা।
গোদাগাড়ী থানা আয়োজিত ‘মাদকমুক্ত থানা গড়ার লক্ষ্যে’ শীর্ষক সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার ড. আ.ন.ম বজলুর রশীদ। সভাপতিত্ব করেন পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ শাহজাহান। উপস্থিত ছিলেন জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ নাঈমুল হাছানও। সেই সভায় মাদক কারবারিদের নিয়ে দর্শক সারিতে ছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। খোদ থানা-পুলিশই তাঁকে সেই সভায় ডেকেছিল বলে জানা গেছে।
সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে আইনজীবী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য, আজকে এই হলে গোদাগাড়ীর কুখ্যাত মাদক কারবারি বসে আছেন। গোদাগাড়ীর পুলিশ-প্রশাসনের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি, আপনাদের কাছে মাদক কারবারিদের তালিকা আছে। আপনারা এর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেন, যদি এলাকা মাদকমুক্ত করতে চান।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি আজকে হুমকি মনে করছি, এই কথা অনুষ্ঠানে বলার কারণে।’
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে গোদাগাড়ী নাগরিক স্বার্থ-সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি আইনজীবী সালাহউদ্দিন বিশ্বাস বলেন, ‘এখানে মাদক নির্মূল করতে হলে যাঁরা আসবেন, তাঁদের আসার আগে-পরে আয়-ব্যয়ের হিসাব নেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। তা না হলে এভাবেই পুলিশের সঙ্গে মাদক কারবারিরা থাকবেন।’
জাহাঙ্গীরকে মাদকবিরোধী কমিউনিটি পুলিশিং সভায় ডাকার বিষয়ে কথা বলতে গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। অনুষ্ঠানে মাদক কারবারি অংশ নেওয়ার বিষয়ে ওই সভার সভাপতি ও পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘আমরা চাচ্ছি, মানুষের মাঝে সচেতনতা যেন বৃদ্ধি পায়। পাবলিকই যেন তাদের ধরে। এই যে সে সভায় এসেছে, আপনারা ধরছেন। এরপর তো কোনো ধরনের অজুহাত নিয়ে আসার সুযোগ থাকবে না। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই আমরা তাকে ধরব।’
ডিআইজি শাহজাহান আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে তালিকা আছে। নিশ্চিত থাকেন, আমরা ১ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত কঠোর অভিযান চালাব।’
গোদাগাড়ী পৌরসভার একটি মহল্লা পরিচিত ‘হেরোইনের গ্রাম’ হিসেবে। মহল্লার মূল নাম মাদারপুর। সেই মহল্লার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর। ২০১০ সালের দিকে তিনি মাদক কারবারের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে পড়েন। পুলিশের তালিকায় অল্প দিনেই তার নাম উঠে আসে দুই নম্বরে। ওই সময় উপজেলার সাহাব্দিপুর থেকে একটি অবৈধ পিস্তল ও হেরোইনসহ জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
অল্প কিছুদিন জেলে থেকে জামিনে বেরিয়ে জাহাঙ্গীর আবারও ফেরেন মাদক কারবারে। কিছুদিন পর ইয়াবার বড় একটি চালানসহ গ্রেপ্তার হন নারায়ণগঞ্জে। এবারও জামিনে বের হন। সর্বশেষ ২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর ১ কেজি হেরোইনসহ যশোরে র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন জাহাঙ্গীর ও তাঁর ছয় সহযোগী। সেই মামলা থেকেও জামিনে এসে তিনি এলাকায় ঘুরছেন।
জাহাঙ্গীরের বাবা নওশাদ একসময় জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি করতেন। তাই এলাকায় তিনি ‘নওশাদ জামাতি’ নামে পরিচিত। তিনি গোদাগাড়ী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন। মাদক কারবারের কারণে জামায়াত তাঁকে বহিষ্কার করে। এখন তিনি বিএনপির গোদাগাড়ী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি।
নওশাদ আলীও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি। ২০১৭ সালের মাঝামাঝি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-২ থেকে ওই তালিকা রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে আসে। তালিকায় দুই নম্বরে ছিল নওশাদ আলীর নাম। নওশাদ পৌরসভার মেয়র পদে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে জাহাঙ্গীর আলমকে একাধিকার ফোন করা হলেও ধরেননি। তাঁর বাবা নওশাদ আলী জানান, তাঁর ছেলের ওই সভায় যাওয়া নিয়ে সামাজিক মাধ্যমের সমালোচনা তিনি দেখেছেন। তিনি বলেন, ‘এগুলো বেয়াদব। লাথ (লাথি) খাওয়ার কাজ করেছে। এগুলা প্রমাণ করতে পারবে?’
ছেলের নামে একাধিক অস্ত্র ও মাদক মামলা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় তাঁর নিজের নাম থাকার প্রশ্নে নওশাদ আলী বলেন, ‘এগুলো সব হাসিনার আমলের মামলা। মামলা আছে। কিন্তু আমরা কেউ মাদকের সঙ্গে জড়িত না, একেবারেই না। এগুলো সব অপপ্রচার।’