হোম > সারা দেশ > পিরোজপুর

বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গু সংক্রমণে শীর্ষে পিরোজপুর, শয্যাসংকটে ভোগান্তি

পিরোজপুর প্রতিনিধি

বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্তে শীর্ষে পিরোজপুর

পিরোজপুরে ডেঙ্গু সংক্রমণ দিনদিন বেড়েই চলেছে। কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। ১০০ শয্যাবিশিষ্ট পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে ধারণক্ষমতার চেয়ে চার গুণ রোগী ভর্তি থাকায় সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

চলতি বছরের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে মোট ২ হাজার ৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। যা বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। জেলায় এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৪০ জন ডেঙ্গু রোগী জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে জেলা হাসপাতাল ও বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ৯৯ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে ২৭ জন, নাজিরপুরে ১৬ জন, নেছারাবাদে ২৭ জন, কাউখালীতে ৭ জন, ভান্ডারিয়ায় ১৯ জন এবং মঠবাড়িয়ায় ৩ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন। তবে জিয়ানগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে কোনো ডেঙ্গু রোগী ভর্তি নেই। চিকিৎসা শেষে ইতিমধ্যে ১ হাজার ৯৩৬ জন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

চলতি বছরে হাসপাতালভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ৯১০ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে। এ ছাড়া ভান্ডারিয়ায় ৩৮৯, নেছারাবাদে ৩৫৯, নাজিরপুরে ১৫০, কাউখালীতে ১৩৬ ও মঠবাড়িয়ায় ৯২ জন ভর্তি হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, ১০০ শয্যাবিশিষ্ট পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে ধারণক্ষমতার চেয়ে চার গুণ বেশি রোগী ভর্তি রয়েছেন। রোগীর সংখ্যা বাড়ায় পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে দেখা দিয়েছে তীব্র শয্যা ও জায়গাসংকট। ফলে বাধ্য হয়ে সাধারণ রোগীদের কাছাকাছি মেঝে ও বারান্দায় রেখেই ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। যা নিয়ে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। পর্যাপ্ত টয়লেট না থাকায়ও রোগীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এ ছাড়াও নার্স ও চিকিৎসকসংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগীরা।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী মুয়াজ বলেন, ‘ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চার দিন ধরে হাসপাতালের মেঝেতে ভর্তি রয়েছি। জেলা হাসপাতালে রোগীর যে চাপ, তাতে ঠিকমতো থাকার জায়গা ও সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তীব্র চিকিৎসকসংকট ও নার্সসংকট রয়েছে। বাথরুমের ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে। মাত্র কয়েকটি বাথরুম চার শতাধিক রোগী ব্যবহার করছেন। অতি দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করা দরকার।’

আরেক রোগী রোকেয়া আক্তার বলেন, ‘দুদিন ধরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে ভর্তি রয়েছি। ওষুধ ও স্যালাইন পেলেও প্রচণ্ড রোগীর চাপে সেবা দিতে পারছেন না নার্স ও চিকিৎসকেরা। আমরা কোনোভাবেই ভালো সেবা পাচ্ছি না।’

রোগীর স্বজন মনোয়ারা জানান, ‘আমার ছেলে হাসপাতালে ভর্তি পাঁচ দিন ধরে। আমরা সেবা সম্পর্কে কী বলব, রোগীর চেয়ে স্বজন বেশি। ডেঙ্গু ও অন্যান্য রোগীদের মিলেমিশে থাকতে হচ্ছে। সব ডেঙ্গু রোগী ছড়িয়ে পড়েছেন হাসপাতালের বিভিন্ন মেঝেতে।’

রোগী হাসিব বলেন, ‘আমরা ওষুধ ও স্যালাইন পাচ্ছি, কিন্তু হাসপাতালে জায়গা পাচ্ছি না।’

পিরোজপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি থাকেন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন ৪০ জন। ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কিট, ওষুধপত্র ও আনুষঙ্গিক চিকিৎসাসামগ্রী পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত রয়েছে। চিকিৎসায় কোনো ঘাটতি নেই।’

পিরোজপুরের সিভিল সার্জন মো. মতিউর রহমান জানান, জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পর্যাপ্ত ওষুধ, স্যালাইন ও বিনা মূল্যে পরীক্ষার অ্যান্টিজেন কিট প্রস্তুত রয়েছে।

পিরোজপুর পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান বলেন, ‘এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস করতে শহরের বিভিন্ন জমে থাকা পানির স্থানে ও ড্রেনগুলোতে নিয়মিত স্প্রে করা হচ্ছে এবং সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হচ্ছে।’

পিরোজপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন জানান, বিভিন্ন পুকুর, ডোবা ও নালা পরিষ্কারের পাশাপাশি জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, আইইডিসিআরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, পিরোজপুরে প্রচুর সুপারি ও নারকেলগাছ থাকায় কাটা গাছের গোড়ায় জমে থাকা পানি, নারকেলের খোসা, ভবনের ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, স্থানীয় নালা এবং বিভিন্ন নার্সারির টবে জমে থাকা পানিতে প্রচুর পরিমাণে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে।