হোম > সারা দেশ > পিরোজপুর

১২০ শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে উপস্থিত মাত্র ৭ জন, এসএসসিতে ১১ জনে পাস ১

নেছারাবাদ (পিরোজপুর) প্রতিনিধি 

পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার মৈশানী বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

১১ জন শিক্ষক ও তিনজন কর্মচারী। কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী ১২০ জন। অথচ চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে মাত্র ১১ জন। তাদের মধ্যে পাস করেছে মাত্র একজন। এর মধ্যে ছয়জনই ছিল পার্শ্ববর্তী বিদ্যালয়ের টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে ঝরে পড়া শিক্ষার্থী। এমন হতাশাজনক ফলাফল, শিক্ষার্থীদের কম উপস্থিতি এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার মৈশানী বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে।

১০ আগস্ট এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টির ফলাফল নিয়ে দৈনিক ‘আজকের পত্রিকা’য় প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে জেলাজুড়ে আলোচনা শুরু হয়। এর পরদিন মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী সংকট ও ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ জানতে সরেজমিন গেলে উঠে আসে নানা অসংগতির অভিযোগ।

১২০ শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে উপস্থিত ৭

বিদ্যালয়ের নথিপত্রে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১২০ জন দেখানো হলেও মঙ্গলবার সরেজমিন দেখা যায়, ষষ্ঠ শ্রেণিতে একজন, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী নেই। নবম শ্রেণিতে তিনজন এবং দশম শ্রেণিতে তিনজন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল। সব মিলিয়ে সেদিন বিদ্যালয়ে উপস্থিত পাওয়া যায় মাত্র সাতজন শিক্ষার্থী।

অভিযোগ রয়েছে, পর্যাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী থাকা সত্ত্বেও তাঁদের একটি অংশ নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকেন না। ফলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও দিন দিন কমছে। শিক্ষক উপস্থিতির এমন চিত্রের প্রভাব পড়ছে পাঠদান ও শিক্ষার পরিবেশে।

৬০ সেট বইয়ের চাহিদা

বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিয়ে আরও প্রশ্ন উঠেছে চলতি শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ের হিসাব ঘিরে। উপজেলা শিক্ষা অফিসে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থীর চাহিদা দেখিয়ে ৬০ সেট বই নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। অথচ সরেজমিন নিয়মিত শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিল তার তুলনায় একেবারেই নগণ্য।

বাইরে থেকে শিক্ষার্থী এনে এসএসসি পরীক্ষায়?

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, শিক্ষার্থী সংকটের কারণে পার্শ্ববর্তী বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের সংগ্রহ করে মৈশানী বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

চলতি বছর পার্শ্ববর্তী বিদ্যালয়ের টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য ছয়জন শিক্ষার্থীকে এনে ফরম পূরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের বিনিময়ে মোট ৩৪ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। তবে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পর্ষিয়া রানী হালদার টাকার পরিমাণ ৩৪ হাজার টাকা নয় বলে দাবি করেছেন।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পঙ্কজ কুমার মণ্ডল শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে যাওয়া, ছোট পরিবার এবং এলাকার ভৌগোলিক পরিবেশকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে ১১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র একজন পাস করার বিষয়ে তিনি বিদ্যালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সমস্যার কথা তুলে ধরেন।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পর্ষিয়া রানী হালদারও শিক্ষার্থী সংকটের পেছনে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, ওয়াশরুমের সমস্যা এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে না পারার বিষয়টি উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, এসএসসি পরীক্ষায় অন্তত ১০-১২ জন পরীক্ষার্থী দেখাতে হয়। এ কারণে পাশের সপ্তগ্রাম সম্মিলনী বিদ্যালয়ের টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারা কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ফরম পূরণ করিয়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

তবে অন্য বিদ্যালয়ের টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারা শিক্ষার্থী এনে পরীক্ষার্থী বাড়ানোর বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, চলতি বছর পাশের বিদ্যালয়ের ছয়জন শিক্ষার্থীকে এনে ফরম পূরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের জন্য মোট ৩৪ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা বলেছেন, টাকার পরিমাণ এত নয়।

লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হবে

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জহিরুল আলম বলেন, ‘বিদ্যালয়ে ১১ জন পরীক্ষা দিয়ে একজন পাস করেছে। অন্য স্কুলের শিক্ষার্থী এনে পরীক্ষা দেওয়ার বিষয়টিও শুনেছি। সবকিছু লিখিতভাবে জানতে চাওয়া হবে।’

এদিকে একদিকে ১১ জন শিক্ষক ও তিনজন কর্মচারী, অন্যদিকে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি সাত-আটজনে সীমাবদ্ধ—এমন বাস্তবতায় বিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহল।

বিশেষ করে এসএসসি পরীক্ষায় ১১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র একজন পাস, কাগজে ১২০ শিক্ষার্থী দেখানো, বাস্তবে নগণ্য উপস্থিতি, ৬০ সেট বইয়ের চাহিদা এবং বাইরে থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থী এনে পরীক্ষার্থী বাড়ানোর অভিযোগ—সবকিছু মিলিয়ে মৈশানী বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যালয়টির প্রকৃত শিক্ষার্থী সংখ্যা, শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতি, পাঠ্যবইয়ের চাহিদা ও বিতরণ, এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ফরম পূরণ এবং বাইরে থেকে শিক্ষার্থী এনে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত করা হোক। এতে কাগজের হিসাব ও বাস্তব চিত্রের পার্থক্যের প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসবে।