পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪)-এর আওতায় ‘এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি’ প্রকল্পের প্রায় ১৫ লক্ষাধিক টাকার কাজ বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সাতটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ অর্থের বিপরীতে নামমাত্র সংস্কারকাজ দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়েছে। একটি বিদ্যালয়ে কাজ শুরু না করেই বিল উত্তোলনের প্রস্তুতি নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নেছারাবাদের সাতটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংস্কার ও মেরামতের জন্য এ বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের আওতায় দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়ন, বিকল্প শ্রেণিকক্ষ প্রস্তুত, দুর্যোগ প্রস্তুতি পরিকল্পনা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও আনন্দদায়ক শিখন পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা থাকলেও অধিকাংশ বিদ্যালয়ে শুধু দেয়ালে রং, সামান্য প্লাস্টার এবং সীমিতসংখ্যক বেঞ্চ ও ফ্যান কেনার মাধ্যমে কাজ শেষ দেখানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলা এলজিইডি অফিসের প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। তবে কয়েকটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কাজ না করিয়েই বিভিন্ন দোকান থেকে নির্মাণসামগ্রীর রসিদ সংগ্রহ করে বিল ভাউচার প্রস্তুত করেন। পরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু কর্মকর্তার প্রত্যয়নের মাধ্যমে বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন করা হয়।
সরেজমিনে ৭১ নম্বর বিশাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ছয় জোড়া বেঞ্চ, একটি সিলিং ফ্যান এবং ভবনের কিছু অংশে রং করার কাজ দেখা গেছে।
বাটনতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে একটি দরজা মেরামত, কিছু অংশে প্লাস্টার ও রং করার কাজ হয়েছে।
১৩৯ নম্বর দক্ষিণ করফা গয়েশকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও এখনো কোনো কাজ শুরু হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, বরাদ্দের অর্থে পুরোনো ভবনের পরিবর্তে নতুন নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করা হয়েছে। বিল উত্তোলনের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং বিল শিক্ষা অফিসে জমা রয়েছে।
২১ নম্বর স্বরূপকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২ লাখ ৯৮ হাজার টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ভবনের বিভিন্ন স্থানে সীমিত আকারে প্লাস্টার ও রং করার কাজ দেখা গেছে। অথচ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুজন সমদ্দারের দাবি, তাঁরা বরাদ্দের পুরো টাকার কাজ করেছেন।
জগন্নাথকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আড়াই লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ভবনের কিছু অংশে ঘষামাজা, বালু-সিমেন্টের প্রলেপ এবং ছাদের কয়েকটি স্থানে প্লাস্টার করে রং দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেখর বলেন, `বিদ্যালয়ের ছাদসহ বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টার ও রং করার পাশাপাশি আরও কিছু কাজ করা হয়েছে।'
গুয়ারেখা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বরাদ্দের বিপরীতে বিদ্যালয়ের কোন কোন দেয়ালে নামমাত্র প্লাস্টার ও রং দিয়ে কাজ সেরেছেন। তবে তাদের দাবি, তারা সব টাকার কাজ করেছেন।
একইভাবে ১৬৪ নং পশ্চিম সোহাগদল হাজী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দেড় লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ন্যূনতম কাজ করে সব টাকার কাজ করেছেন বলে দাবি করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদ্যালয়ের শুভানুধ্যায়ীরা অভিযোগ করেন, প্রকল্পের বরাদ্দ অনুযায়ী কাজের বাস্তব চিত্র মিলছে না। উপজেলা এলজিইডি অফিসের উপ-সহকারী প্রকৌশলী বিকাশ চন্দ্র দাস যথাযথভাবে কাজ পরিদর্শন না করেই বিদ্যালয়কে প্রত্যয়ন দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে বিকাশ চন্দ্র দাস বলেন, `কাজের মান যাচাই করেই প্রত্যয়ন দেওয়া হয়েছে। শুধু একটি বিদ্যালয়ের প্রত্যয়ন দেওয়া হয়নি।'
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাইনুল হোসেন বলেন, `এলজিইডির প্রত্যয়ন পাওয়ার পরই বিল পরিশোধ করা হয়। তবে দক্ষিণ করফা গয়েশকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখনো কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় তাদের বিল আটকে রাখা হয়েছে।'
অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।