হোম > সারা দেশ > নীলফামারী

নীলফামারীর ডিমলা: বালু তোলায় ঝুঁকিতে তিস্তা বাঁধ

মাসুদ পারভেজ রুবেল, ডিমলা (নীলফামারী) 

নদীর পাড় ও তীর রক্ষা বাঁধ ঘেঁষে গভীর গর্ত করে উত্তোলন করা হচ্ছে সিল্ট ট্র্যাপের বালু। এতে ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার তিস্তা ব্যারাজ, সেচ প্রকল্পের সড়ক ও আশপাশের জনবসতি। সম্প্রতি তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

নীলফামারীর ডিমলায় তিস্তা সেচ প্রকল্পের সিল্ট ট্র্যাপের বালু নিলামের শর্ত ভেঙে নদীপাড় ও তীর রক্ষা বাঁধ ঘেঁষে গভীর গর্ত করে উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। কেপিআইভুক্ত তিস্তা ব্যারাজ এলাকার ২০০ মিটারের মধ্যে দিনরাত চলছে এই কার্যক্রম। এতে ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত তীর রক্ষা বাঁধ, তিস্তা ব্যারাজ, সেচ প্রকল্পের সড়ক এবং আশপাশের জনবসতি ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, গত বছর তিস্তা ব্যারাজের অদূরে সিল্ট ট্র্যাপ থেকে ডালিয়া বাইশপুকুর এলাকায় নদীভাঙন রোধে প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। পাশাপাশি তিস্তা সেচ প্রকল্পের পানির প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে সাড়ে ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে সিল্ট ট্র্যাপ খনন করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী খনন করা বালু সিল্ট ট্র্যাপ ও তিস্তা নদীর ধারে তীর রক্ষা বাঁধের কাছে স্তূপ করে রাখে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। গত জুনে সেই বালু নিলামে বিক্রি করে জেলা প্রশাসন, যার পরিমাণ ১১ লাখ ঘনফুট। সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ইজারা পান স্থানীয় ঠিকাদার জয়নাল আবেদীন।

অভিযোগ রয়েছে, জয়নাল আবেদীন প্রথমে ইজারার বৈধ বালু বিক্রি করলেও দুই মাস ধরে সিল্ট ট্র্যাপের নিচে এবং ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত তীর রক্ষা বাঁধ ঘেঁষে গভীর গর্ত করে মাটি ও বালু তুলছে একটি প্রভাবশালী চক্র।

ইজারাদার জয়নাল আবেদীন জানান, কার্যাদেশ অনুযায়ী তিনি গত ১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইজারার বালু সরিয়ে নিয়েছেন। এর পর থেকে স্থানীয় কিছু লোক সেখানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। বিষয়টি তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও জানিয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সিল্ট ট্র্যাপের ১০ মিটার দূরত্বের মধ্যে তীর রক্ষা বাঁধ ঘেঁষে প্রায় তিন একর জায়গাজুড়ে এক্সকাভেটর দিয়ে ১৫-২০ ফুট গভীর খাল তৈরি করা হয়েছে। নদীপাড় থেকে ২০০ মিটার দূরত্বে তিস্তা ব্যারাজ ও সরকারি পরিদর্শন বাংলো। ইতিমধ্যে নিলামের বালু তোলা শেষ হলেও এখন নদীপাড়ের মাটি কেটে ডাম্প ট্রাকে করে রংপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় পাচার করা হচ্ছে। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা ভারী ট্রাকে বালু ও মাটি পরিবহনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেচ প্রকল্পের পরিদর্শন সড়ক। কাটা পড়েছে সরকারি গাছও। এতে হুমকিতে পড়েছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।

গভীর গর্ত করে উত্তোলন করা হয়েছে বালু। এতে ঝুঁকিতে পড়েছে তিস্তা সেচ প্রকল্প। ছবি: আজকের পত্রিকা

স্থানীয় বাসিন্দা জাহের আলী, লুৎফর রহমান, মাসুদসহ অন্তত ১০ জন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কাকে বলব, কেউ কথা শোনে না। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ইউএনও অফিসে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। কোনো গুরুত্ব নাই। বাধা দিলে উল্টো প্রভাবশালীরা দাবি করেন, তাঁরা টাকা দিয়ে ইজারা নিয়েছেন এবং প্রশাসনকে নিয়মিত টাকা দেন। আমরা কার কাছে বিচার দেব।’ তাঁদের ভাষ্য, ‘এবারের বর্ষাটা না হয় শেষ। ভবিষ্যতে ঠিকমতো বর্ষা হলে ৭ কোটির বাঁধ, জনবসতি, আবাদি জমি সব নদীতে তলিয়ে যাবে।’ প্রতিবাদ করায় এলাকাবাসীর নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করারও অভিযোগ রয়েছে।

বাসিন্দাদের অভিযোগ, কেপিআইভুক্ত এলাকায় প্রভাবশালী চক্র দিনরাত লাখ লাখ টাকার বালু উত্তোলন করছে। এতে একদিকে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার, অন্যদিকে ভারী যানবাহনে বালু পরিবহন করায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সড়ক ও সেতু। অথচ নিলামের শর্ত এবং প্রচলিত আইনে পরিবেশ ও নদীর স্বাভাবিক গঠন নষ্ট করলে শাস্তির বিধান থাকলেও এ নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেই স্থানীয় প্রশাসনের।

ডালিয়া পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, বাঁধের নিচ থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু ও মাটি তোলা হলে যেকোনো মুহূর্তে বাঁধ ধসে নদীর আশপাশের এলাকায় বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিতে পারে।

এ বিষয়ে ডিমলা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরানুজ্জামান বলেন, অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত সাপেক্ষে নিলামের শর্ত ভঙ্গ করা হয়ে থাকলে এবং অনিয়মের সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।