মুসলিম পরিচয়ে এক মুসলিম তরুণীকে প্রথমে বিয়ে করেন অর্জুন ধর হীরা ওরফে হীরা ধর (৩০) নামে এক যুবক। অ্যাফিডেভিট করে মুসলিম রীতি অনুযায়ী নাম রাখেন হীরা মিয়া। আট বছর পর দুই সন্তান রেখে ফের হিন্দু হয়ে আরেক হিন্দু তরুণীকে বিয়ে করেন তিনি। এর ফলে মুসলিম তরুণী তাঁর দুই সন্তানের বাবার পরিচয় নিয়ে পড়েছেন বিপাকে। নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলায় এ ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় তাঁর প্রথম স্ত্রী শিপুল আক্তার খানম (২৭) আদালতে প্রতারণার মামলা করেছেন। মামলায় অর্জুনের মা কৃষ্ণা রানী ঘোষকেও (৫৮) আসামি করা হয়েছে।
আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। আজ মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বাদীপক্ষের আইনজীবী মোশারফ হোসেন শুভ মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে গত ২০ জুলাই নেত্রকোনা সদর আমলি আদালতে মামলাটি করেন শিপুল খানম।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নেত্রকোনা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. জামান আলী বলেন, মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। দ্রুতই তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
অভিযুক্ত অর্জুন ধর হীরা জেলার খালিয়াজুরী উপজেলার শালদীঘা গ্রামের মৃত জয় কৃষ্ণধরের ছেলে। আর ভুক্তভোগী দুই তরুণী মোহনগঞ্জ পৌরশহরের দৌলতপুর এলাকার বাসিন্দা।
মামলার অভিযোগ, ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অর্জুন ধর হীরা একসময় মোহনগঞ্জ পৌর শহরের দৌলতপুর এলাকায় বসবাস করতেন। তখন একই এলাকার শিপুল আক্তারের সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০১৪ সালে আদালতের মাধ্যমে অ্যাফিডেভিট করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন অর্জুন। এ সময় তিনি নিজের নাম মো. হীরা মিয়া রাখেন। এরপর মুসলিম রীতিতে শিপুলকে বিয়ে করেন।
২০১৫ সালে তাঁদের একটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। মুসলিম নামানুসারে তাঁর নাম রাখা হয় জান্নাতুল হিয়া। ২০২২ সালে তাঁদের আরও একটি ছেলেসন্তান জন্ম নেয়। তার নাম রাখা হয় আব্দুল্লাহ। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, মুসলিম পরিচয়ে থাকার সময় হীরা নামাজ-রোজাও পালন করতেন। তবে শিপুলের অভিযোগ, বারবার বলার পরও হীরা তাঁদের বিয়ের কাবিন রেজিস্ট্রি করেননি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০২২ সালে দ্বিতীয় সন্তান জন্মের পরপরই হীরা তাঁর মা কৃষ্ণা রানীর প্ররোচনায় আবার হিন্দু ধর্মে ফিরে যান। এরপর পাশের এলাকার এক হিন্দু তরুণীকে গোপনে বিয়ে করেন। বিষয়টি জানতে পেরে শিপুল তাঁর কাছে কারণ জানতে চাইলে হীরা তাঁকে যৌতুকের দাবিতে মারধর ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতন করতে শুরু করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। হীরা প্রায়ই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তাঁকে নির্যাতন করতেন বলেও অভিযোগ করেন শিপুল।
মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়, হীরা অন্য এক তরুণীকে বিয়ে করার বিষয়টি জানার পর শিপুলের ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। পরিস্থিতির প্রতিকার চেয়ে ২০২৫ সালের ২০ মে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন তিনি। পরে উভয় পক্ষের সম্মতিতে ২০২৫ সালের ৪ জুন নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে একটি আপসনামা ও অ্যাফিডেভিট করা হয়। এতে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বহন, জমি কিনে বাড়ি নির্মাণসহ বিভিন্ন শর্ত উল্লেখ ছিল।
তবে শিপুলের অভিযোগ, ওই অ্যাফিডেভিট করার পরও তাঁর স্বামী কোনো শর্ত পূরণ করেননি। বরং কোনো শর্তই পূরণ করবেন না বলে জানিয়ে দেন। এ সময় তাঁর শাশুড়ি কৃষ্ণা রানী ঘোষও তাঁকে ‘যা পারিস কর’ বলে চলে যান বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
শিপুল খানম বলেন, ‘স্বামী ও শাশুড়ি পরস্পর যোগসাজশ ও প্ররোচনায় আমার সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে প্রতারণা করেছেন। আমার সন্তানদের বাবার পরিচয় নিয়ে খুবই শঙ্কিত আছি। সমাজে তারা কী পরিচয়ে বড় হবে, তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে—আল্লাহই জানেন।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অর্জুন ধর হীরা বলেন, ‘অনেক আগেই আমি শিপুলকে ডিভোর্স দিয়েছি। এরপর আমি কী করব, সেটা তাঁর জানার বিষয় নয়।’ এ কথা বলেই তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।