অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র (ফায়ার এক্সটিংগুইশার) রিফিলের নামে প্রতারণার অভিযোগে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার কামরুজ্জামান সুমনকে বদলি করা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে কর্তৃপক্ষ। তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন নেত্রকোনা ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মো. জাকির হোসেন।
গতকাল বুধবার কামরুজ্জামান সুমনকে কক্সবাজারের টেকনাফে বদলি করা হয়।
স্থানীয়রা জানান, বৃহস্পতিবার ভোরে পরিবারের সদস্য ও মালামাল নিয়ে তিনি মোহনগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ত্যাগ করেন।
মোহনগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস স্টেশন সূত্রে জানা যায়, কামরুজ্জামান সুমনের মূল কর্মস্থল পাশের খালিয়াজুরী উপজেলা ফায়ার সার্ভিস স্টেশন। স্টেশনটি চালু না থাকায় তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে মোহনগঞ্জ স্টেশনের দায়িত্বও পালন করছেন। ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে তিনি দুই স্টেশনের দায়িত্বে রয়েছেন।
স্থানীয় ও অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলার বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে ফায়ার এক্সটিংগুইশার সংগ্রহ করে সেগুলোর ড্রাই কেমিক্যাল পাউডার পরিবর্তন না করেই পরিষ্কার করা হতো। পরে ময়মনসিংহের ‘দ্য সেফ মার্ট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নকল স্টিকার লাগিয়ে রিফিল ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ লেখা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো যন্ত্রে রিফিলকারীর স্বাক্ষরও পাওয়া যায়নি।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তার ওপর আস্থা রেখেই তাঁরা যন্ত্রগুলো রিফিলের জন্য দিতেন। এ জন্য প্রতিটি যন্ত্রের বিপরীতে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হলেও কোনো ভাউচার দেওয়া হতো না। ফলে যন্ত্রের ভেতরের রাসায়নিক আদৌ পরিবর্তন করা হয়েছে কি না, তা তাঁরা জানতে পারতেন না।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় একটি ডিজিটাল প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠান থেকে ‘দ্য সেফ মার্ট’-এর নকল স্টিকার ছাপানো হতো। পরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ফায়ার এক্সটিংগুইশার সংগ্রহ করে রিফিলের নামে টাকা নেওয়ার পর সেগুলোতে ওই স্টিকার লাগিয়ে দেওয়া হতো।
মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঁচ শতাধিক ফায়ার এক্সটিংগুইশার রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
মোহনগঞ্জ পৌর শহরের শাহজালাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক মাহবুব আলম সেলিম বলেন, ‘গতকাল নেত্রকোনা থেকে ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা এ বিষয়ে তদন্তে এসেছিলেন। তিনি বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিকের সঙ্গে কথা বলেছেন। আমরা তাঁকে প্রকৃত ঘটনা জানিয়েছি।’
নেত্রকোনা ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে গতকাল বুধবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করি। সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকদের সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে কথা বলেছি। তদন্তে প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তা কামরুজ্জামান সুমনকে তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়টি গুরুতর হওয়ায় বিস্তারিত তদন্তের জন্য তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। অন্য জেলার কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে কমিটিটি করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তদন্ত কমিটির সদস্যদের নাম-পদবি এবং কত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে—এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি।
উল্লেখ্য, কামরুজ্জামান সুমনের বিরুদ্ধে এর আগে মাদক সেবন ও সরকারি মালামাল বিক্রির অভিযোগও উঠেছিল। ২০২১ সালে রংপুরে স্টেশন অফিসারের দায়িত্বে থাকার সময় তাঁর ফেনসিডিল সেবনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একই সময়ে সরকারি মালামাল বিক্রির অভিযোগও ওঠে। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছিল বলে জানা যায়।
তখন সুমনের দাবি ছিল, তাঁকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ফেনসিডিল সেবন করানো হয়েছিল। পরে তাঁকে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় বদলি করা হয়। তবে ওই ঘটনায় তিনি অর্থের বিনিময়ে শাস্তি এড়িয়ে শুধু বদলির মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।