হোম > সারা দেশ > নেত্রকোণা

গর্ভপাতের তথ্য গোপন করে রিপোর্টে ‘পায়ে ঘষা’, সিভিল সার্জন বললেন—‘বিষয়টা ভুলে গেছি’

নেত্রকোনা প্রতিনিধি

সিভিল সার্জন গোলাম মাওলা। ছবি: সংগৃহীত

অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে লাথি মারার ঘটনায় গর্ভপাত হলেও মেডিকেল রিপোর্টে তা গোপন করে শুধু ‘পায়ে ঘষা’ লাগার কথা উল্লেখ করার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ওই রিপোর্টে তিন চিকিৎসকের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা। এ ঘটনায় নেত্রকোনার সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও এক মাসের বেশি সময়েও তদন্তে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো অভিযোগের বিষয়টি ভুলে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন সিভিল সার্জন গোলাম মাওলা।

গতকাল বুধবার বিকেলে অভিযোগের পর গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন বলেন, ‘ওইটা মোহনগঞ্জের বিষয়, সেখানেই অভিযোগ দিয়েছে, তারা দেখবে। আমি সবকিছু দেখার সময় পাই না।’

অভিযোগটি তাঁর কাছেই দেওয়া এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন—এ কথা জানানো হলে সিভিল সার্জন বলেন, ‘ওহ, আমি রিসিভ করেছি? বিষয়টা ভুলে গেছি, অনেক ফাইলের নিচে পড়ে গেছে। আমাকে অভিযোগের কপিটা একটু পাঠান। দেখে আগামী সপ্তাহে তদন্ত করা হবে।’

গত ২৯ জুলাই জেলা সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন ভুক্তভোগী গৃহবধূর স্বামী সালমান শাহ। পরে ১ আগস্ট সিভিল সার্জন অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। এরপরও তদন্ত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী ও তাঁর স্বামী।

সালমান শাহ মোহনগঞ্জ উপজেলার সুয়াইর গ্রামের মো. হাসিম উদ্দিনের ছেলে। তাঁর অভিযোগ, গত ৩ জুন তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী ফেরদৌস মিয়া তাঁর তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আশা আক্তারকে (২২) মারধর করেন। একপর্যায়ে তাঁর তলপেটে লাথি মারলে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরে তাঁকে মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাঁকে ভর্তি ও আলট্রাসনোগ্রাফি করার পরামর্শ দেন।

অভিযোগে বলা হয়, একই দিন একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করা আলট্রাসনোগ্রাফিতে তিন মাসের গর্ভধারণ ও জীবিত ভ্রূণের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তবে পরদিন অপর একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিবেদনে ‘নরমাল স্টাডি’ উল্লেখ করা হয়। এতে গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয় বলে দাবি করেন সালমান শাহ।

এ ঘটনায় ফেরদৌস মিয়ার বিরুদ্ধে মোহনগঞ্জ থানায় মামলা হলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে ৫ জুন আশা আক্তারকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

সালমান শাহর অভিযোগ, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) জয় পাল মেডিকেল রিপোর্ট চেয়ে মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আবেদন করেন। ২৮ জুন রিপোর্ট দেওয়ার কথা থাকলেও এর এক দিন আগে, ২৭ জুন একটি রিপোর্ট আদালতে পাঠানো হয়। পরে তদন্ত কর্মকর্তাকেও ওই রিপোর্টের একটি কপি দেওয়া হয়।

সালমান শাহ বলেন, ওই রিপোর্টে আঘাতজনিত গর্ভপাত বা আলট্রাসনোগ্রাফির কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। বরং শুধু ‘পায়ে ঘষা’ লাগার কথা লেখা হয়। ওই রিপোর্ট আদালতে জমা দেওয়ার পর অভিযুক্ত ফেরদৌস মিয়া জামিন পান।

সালমান শাহ আরও অভিযোগ করেন, বিষয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে জানালে গত ২ জুলাই নতুন করে একটি মেডিকেল রিপোর্ট দেওয়া হয়। তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আগের রিপোর্টটি ভুয়া ও তাতে থাকা চিকিৎসকদের স্বাক্ষর জাল বলে জানায়।

অভিযোগে থাকা প্রথম মেডিকেল রিপোর্টে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তৎকালীন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) অলক কান্তি তালুকদার, চিকিৎসক পার্থ সেন ও মোস্তাফিজুর রহমানের স্বাক্ষর রয়েছে। তবে ওই তিন চিকিৎসকই জানিয়েছেন, তাঁরা ওই রিপোর্টে স্বাক্ষর করেননি। রিপোর্টটি নকল এবং তাঁদের স্বাক্ষর জাল করে বসানো হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁরা ঘটনার তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

সালমান শাহ প্রশ্ন তোলেন, প্রথম রিপোর্টটি যদি ভুয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেটি কীভাবে হাসপাতাল থেকে আদালত ও তদন্ত কর্মকর্তার কাছে পৌঁছাল। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

ভুক্তভোগী আশা আক্তার বলেন, ‘স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অসহায় মানুষ ভরসা নিয়ে যায়। অথচ সেখান থেকে জাল মেডিকেল রিপোর্ট দিয়ে আমার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। ঊর্ধ্বতনের কাছে বিচার দিলাম। বিচারের আশায় বসে আছি, অথচ তিনি নাকি অভিযোগের বিষয় ভুলে গেছেন। মার খেলাম, পেটের সন্তান নষ্ট হলো, এখন বিচারও পাচ্ছি না।’

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহনগঞ্জ থানার এসআই জয় পাল বলেন, ‘মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল—দুই জায়গা থেকেই মেডিকেল রিপোর্ট হাতে পেয়েছি। সম্প্রতি মমেকের রিপোর্টটি পেয়েছি। দ্রুত মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হবে।’

এসআই আরও বলেন, মামলার প্রধান আসামি ফেরদৌস মিয়া পলাতক রয়েছেন। তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় অবস্থান শনাক্ত করা যাচ্ছে না। তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। মামলার অন্য আসামিরা জামিনে রয়েছেন।

এদিকে গত ৯ আগস্ট মামলাটিতে ফেরদৌস মিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। এর পর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন।