মো. রফিকুল ইসলাম হিরণ একসময় মাছঘাটের শ্রমিক ছিলেন। মাধ্যমিক না পেরিয়েই দন্ত চিকিৎসক বনে গেছেন তিনি। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে চেম্বারও খুলে বসেছেন। তাঁর নামের সঙ্গে ‘এলএমএএফ’ ও ‘ডিএমএ’ পদবি সাঁটিয়ে দিয়েছেন। মোহনগঞ্জ ছাড়াও জেলা সদর ও আটপাড়াতেও হিরণের দন্ত চিকিৎসার চেম্বার রয়েছে। সেখানেও তিনি রোগী দেখেন।
গত শনিবার সকালে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের ওই হাতুড়ে দন্ত চিকিৎসকের ভুল অস্ত্রোপচারের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মো. লিয়ন মিয়া (১৪) নামের এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। গত সোমবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে নিহতের স্বজন ও বিক্ষুব্ধ জনতা ওই হাতুড়ে চিকিৎসকের চেম্বারে ভাঙচুর চালান। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
নিহত লিয়ন মিয়া মোহনগঞ্জ পৌর শহরের টেংগাপাড়া এলাকার খোকন মিয়ার ছেলে। সে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, লিয়নের দাঁতের মাড়ির পাশে মাংস বেড়ে যাওয়ায় গত শনিবার সকালে তাকে চিকিৎসার জন্য মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। এক ব্যক্তি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে থাকা রফিকুল ইসলাম হিরণের চেম্বারে নিয়ে যান। পরিবারের ভাষ্য, ওই ব্যক্তি হিরণকে ভালো চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। পরে ওই দন্ত চিকিৎসক লিয়নের মাড়ির বাড়তি মাংস কেটে দেন। এর পরপরই রক্তক্ষরণ শুরু হয়। চিকিৎসা শেষে ওষুধপত্র দিয়ে লিয়নকে বাড়িতে পাঠানো হয়। পরদিন শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পরিবারের সদস্যরা তাকে আবারও হিরণের কাছে নিয়ে যান। তখন হিরণ নতুন করে ওষুধপত্র লিখে দেন। কিন্তু বাড়িতে নেওয়ার পরও লিয়নের অবস্থার উন্নতি হয়নি।
পরে সোমবার দুপুরে লিয়নকে আবারও ওই চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন চিকিৎসক রোগীকে মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দন্ত চিকিৎসক জয়া রানী দেবনাথের কাছে নিয়ে যান। জয়া রানী দেবনাথ লিয়নের অবস্থা গুরুতর দেখে দ্রুত ময়মনসিংহে নেওয়ার পরামর্শ দেন। এরই মধ্যে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থাকা অবস্থায় লিয়ন অচেতন হয়ে পড়ে। সন্ধ্যা ৬টার দিকে তাকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত লিয়নের বাবা খোকন মিয়া বলেন, ‘লিয়নের দাঁতের মাড়ির পাশে মাংস বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাই। সেখানে গেটের কাছে এক ব্যক্তি ভুল বুঝিয়ে হিরণ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। পরে জানতে পারি, ওই ব্যক্তি দালাল। হিরণ মাড়ির অতিরিক্ত মাংস কেটে দেওয়ার পর থেকেই রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এরপর কয়েক দফা তাঁর কাছে নিয়ে গেলেও লিয়নের অবস্থার অবনতি হতে থাকে। শেষমেশ মারাই গেল।’
স্থানীয় কয়েকজন দন্ত চিকিৎসক জানান, মাছের ঘাটের শ্রমিকের কাজ করত হিরণ। এখন হঠাৎ দন্ত চিকিৎসক হওয়ায় অনেকের মতো তাঁরাও আশ্চর্য হয়েছেন। অন্য উপজেলাতেও তাঁর একাধিক চেম্বার রয়েছে। এসব বন্ধ করা দরকার।
স্থানীয় মৎস্য আড়তদার হক্কু মিয়া বলেন, ‘হিরণ ছোটবেলা থেকেই মাছঘাটের লেবার হিসেবে কাজ করত। আমার ঘাটেও চার-পাঁচ বছর লেবারি করেছে। দুই বছর আগেও তাঁকে ঘাটে লেবারি করতে দেখেছি। কেমনে যে দাঁতের ডাক্তার হয়ে গেল আল্লাহ জানেন।’
হক্কু মিয়া বলেন, ‘ফাইভ-সিক্স পর্যন্ত পড়াশোনা করছে কি না সন্দেহ। তাঁর আবার জেলা সদর ও আটপাড়াতেও চেম্বার আছে। এমন ভুয়া ডাক্তার এই শহরে অনেক আছে, এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে মানুষ এভাবে মরতেই থাকবে।’
মোহনগঞ্জ মাছঘাটের এক সময়ের আড়তদার আল আমিন তালুকদার বলেন, ‘হিরণ দীর্ঘদিন আমার ঘাটে লেবারি করেছে। তারপর আমার ভগ্নিপতির ঘাটেও লেবারি করেছে। পরে কীভাবে যে চিকিৎসক বনে গেছে জানি না। তাঁর লেখাপড়াও তেমন বেশি নাই। বড়জোর সেভেন-এইট।’
অভিযোগের বিষয়ে রফিকুল ইসলাম হিরণ বলেন, ‘ওই ছেলের দাঁতের মাড়ির মাংস পচে ক্যানসার হয়ে গিয়েছিল। আমি শুধু ড্রেসিং করেছি, কোনো অপারেশন করিনি। তেমন বেশি রক্তক্ষরণও হয়নি। আমার চিকিৎসার কারণে তার মৃত্যু হয়নি। আগে থেকেই তার অবস্থা খারাপ ছিল।’
হিরণ আরও বলেন, ‘প্রয়োজন হলে ময়নাতদন্ত করা হোক। উল্টো আমার চেম্বারে হামলা চালিয়ে যন্ত্রপাতি ভাঙচুর করেছে। আমি এর বিচার চাই।’ তবে নিজের চিকিৎসাসংক্রান্ত যোগ্যতা ও পদবি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) অলক কান্তি তালুকদার বলেন, বিষয়টি ওই সময়ই চিকিৎসকেরা আমাকে জানিয়েছেন। এলএমএএফ কোর্সধারীরা কোনো চিকিৎসক নন। কোনো রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার এখতিয়ার তাঁদের নেই। বিষয়টি তদন্ত হওয়া দরকার বলেও জানান তিনি।
মোহনগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল লতিফ বলেন, ‘খবর পেয়ে রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ দেয়নি।’