নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থীকে সহোদর কোটায় ভর্তি করাতে উচ্চ আদালতে ভুল তথ্য উপস্থাপনের অভিযোগ উঠেছে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শেখ মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদের বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ভর্তি হওয়া দুই শিক্ষার্থীর কেউই ওই বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত কারও বোন নয়।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল উচ্চ আদালত দুই শিক্ষার্থীকে সহোদর কোটায় ভর্তির বিষয়ে আদেশ দেন। পরে ওই মাসেই তাদের বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করানো হয়।
ভর্তি হওয়া দুই শিক্ষার্থী হলো মোহনগঞ্জ পৌর শহরের টেংগাপাড়া এলাকার মাহমুদুল হাসান চৌধুরী মানিকের মেয়ে মাহফুজা হাসান এবং একই এলাকার মঞ্জুরুল হকের মেয়ে মারিয়া আক্তার মীম।
বিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাহফুজা হাসান সপ্তম শ্রেণির প্রভাতি শিফটের ‘ক’ শাখায় এবং মারিয়া আক্তার মীম দিবা শিফটের ‘ক’ শাখায় ভর্তি হয়েছে। স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাহফুজা হাসানের কোনো ভাই বা বোন ওই বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে না। মারিয়া আক্তার মীমও তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান।
বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সহোদর কোটায় ভর্তি হতে হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর ভাই বা বোন ওই বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত থাকার বিষয়ে প্রধান শিক্ষকের প্রত্যয়নপত্র প্রয়োজন হয়। সেই প্রত্যয়নের ভিত্তিতেই অভিভাবকেরা আদালতে রিট করেন এবং আদালত আদেশ দেন। তাঁদের অভিযোগ, ওই দুই শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রেও ভুয়া প্রত্যয়ন ব্যবহার করা হয়েছে। একইভাবে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ভর্তি করানো হয়েছে বলেও তাঁরা দাবি করেন। এতে মেধাতালিকায় থাকা অনেক শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
এ ঘটনায় এলাকায় সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। ভর্তি-বঞ্চিত অভিভাবকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
অভিভাবক খান বায়েজিদ অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার সন্তান মেধাতালিকায় থাকার পরও ভর্তি করতে পারিনি। অথচ ভুয়া প্রত্যয়ন দিয়ে আদালতের আদেশ এনে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিরাট ভর্তি-বাণিজ্য হয়েছে ধারণা করছি। নিরপেক্ষ তদন্ত হলে এমন আরও অনেক অনিয়ম বেরিয়ে আসবে।’
মারিয়া আক্তার মীমের মা তাসলিমা আক্তার দাবি করেন, তাঁর মেয়েকে সহোদর কোটায় নয়, ক্যাচমেন্ট এরিয়াভিত্তিক কোটায় ভর্তি করানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আইনজীবীর মাধ্যমে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন আরেক অভিভাবক মাহমুদুল হাসান চৌধুরী মানিক। বিষয়টি তিনিই ভালো বলতে পারবেন।’
মাহফুজা হাসানের বাবা মাহমুদুল হাসান চৌধুরী মানিক এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করে ফোন কেটে দেন। তবে এর আগে তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ভর্তি পরীক্ষার অপেক্ষমাণ তালিকায় তাঁর মেয়ের অবস্থান ছিল ৫০ নম্বরে। পরে অপেক্ষমাণ তালিকার ৪৮ নম্বর পর্যন্ত শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও তাঁর মেয়েকে ভর্তি করানো হয়নি। এ জন্য তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা করেছিলেন এবং সেই মামলার রায়ের ভিত্তিতেই তাঁর মেয়ের ভর্তি হয়েছে।
সপ্তম শ্রেণির প্রভাতি শিফটের শ্রেণিশিক্ষক আল আমিন বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক আমাকে আদালতের আদেশ দেখিয়েছেন। ওই আদেশের ভিত্তিতেই শিক্ষার্থীকে ভর্তি করানো হয়েছে। এর বেশি কিছু আমার জানা নেই।’
দিবা শিফটের শ্রেণিশিক্ষক আবু বসির বলেন, ‘মাহফুজা হাসান সহোদর কোটায় ভর্তি হয়েছে। প্রধান শিক্ষক বলেছেন- আদালতের রায়ের ভিত্তিতে উপজেলা ভর্তি কমিটির রেজুলেশনের মাধ্যমে যথাযথ নিয়ম মেনেই তাকে ভর্তি করা হয়েছে। পরে শুনেছি, তার কোনো সহোদর বিদ্যালয়ে পড়ে না।’
সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শেখ মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ। তিনি বলেন, ‘অভিভাবকরা উচ্চ আদালতের আদেশ নিয়ে এসেছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সভাপতিত্বে ভর্তি কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের ভর্তি করা হয়েছে। আমি কোনো ভুয়া প্রত্যয়ন দিইনি। তাঁরা কীভাবে রায় পেয়েছেন, সেটি আমার জানা নেই।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও বিদ্যালয়ের ভর্তি কমিটির সভাপতি আমেনা খাতুন বলেন, ‘বিষয়টি আলোচনায় আসার পর প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে ভর্তিসংক্রান্ত সব নথি নেওয়া হয়েছে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে সেগুলো যাচাই করতে বলা হয়েছে। শুধু এই দুই শিক্ষার্থী নয়, আদালতের নির্দেশে যত ভর্তি হয়েছে, সব কটিই খতিয়ে দেখা হবে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল কবীর বলেন, ‘ইউএনও দুইদিন আগে আদালতের দুটি আদেশ আমার কাছে দিয়ে বলেছেন-এগুলো জমা রাখেন, পরে এ বিষয়ে কথা বলব। তদন্তের বিষয়ে কিছু বলেননি। পরে ব্যস্ততার কারণে তার সঙ্গে আর বসা হয়নি।’
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এর আগে গত মার্চে একই বিদ্যালয়ের সরঞ্জাম কেনাকাটায় প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগও ওঠে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শেখ মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদের বিরুদ্ধে। সে ঘটনায় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) তদন্ত করে। ময়মনসিংহ বিভাগের উপপরিচালক মো. নাসির উদ্দীনের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়ে প্রতিবেদন অধিদপ্তরে জমা দিলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।