হোম > সারা দেশ > নরসিংদী

দুই হাত নেই, তবু পা দিয়ে লিখে আলো ছড়াচ্ছেন নরসিংদীর ‘দুখু মিয়া’

মো. সাইদুল ইসলাম, নরসিংদী

জীবনসংগ্রামের এক জীবন্ত ও অনন্য দৃষ্টান্ত আলতাফ হোসেন। ছবি: আজকের পত্রিকা

জীবন মানেই সংগ্রাম আর সেই সংগ্রামের এক জীবন্ত ও অনন্য দৃষ্টান্ত আলতাফ হোসেন। তবে নিজ গ্রাম ও আশপাশের মানুষের কাছে তিনি পরিচিত ‘দুখু মিয়া’ নামে। জন্মের পর থেকেই তাঁর দুটি হাত নেই। কিন্তু এই চরম শারীরিক প্রতিবন্ধকতাও তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মেনেছে। হাত না থাকলেও পা দিয়ে লিখেই তিনি পড়াশোনা শেষ করেছেন, হয়েছেন শিক্ষক এবং নিজেই গড়ে তুলেছেন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পা দিয়ে লিখেই তিনি পড়াচ্ছেন কোমলমতি শিক্ষার্থীদের। তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্কুলে বর্তমানে পড়াশোনা করছে ১৪৫ জন শিক্ষার্থী।

নরসিংদী সদর উপজেলার পাঁচদোনা ইউনিয়নের নগর পাঁচদোনা এলাকায় ১৯৬২ সালে জন্মগ্রহণ করেন আলতাফ হোসেন। তাঁর বাবার নাম তমিজ উদ্দিন। জন্মের পর তাঁর তিন ভাই মারা যান। আলতাফ হোসেন জন্মের পর পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, তাঁর দুই হাত নেই। এতে মা-বাবা ও দাদা-দাদির মনে কষ্ট ও আক্ষেপ তৈরি হয়। তাঁর দাদা আদর ও আক্ষেপ মিশিয়ে নাতির নাম রাখেন ‘দুখু মিয়া’। সেই থেকে তিনি দুখু মিয়া নামে পরিচিত।

পা দিয়ে লিখে বিএ পাস

পাঁচদোনা ইউনিয়নের দীঘিরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। ছোটবেলা থেকেই দুই হাত না থাকায় পা দিয়ে লেখার অভ্যাস গড়ে তোলেন তিনি। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে ১৯৮২ সালে মাধ্যমিক, ১৯৮৪ সালে উচ্চমাধ্যমিক ও ১৯৮৬ সালে নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে বিএ পাস করেন দুখু মিয়া।

চাকরি মেলেনি, তাই জমি বিক্রি করে স্কুল

নিজের জীবনসংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে দুখু মিয়া বলেন, ‘জীবন মানেই সংগ্রাম। আমরা জীবনকে যতটা সহজ ভাবি, আসলে ততটা সহজ নয়। শিক্ষাজীবন শেষ করে আমি বিভিন্ন চাকরির ভাইভা পর্যন্ত গিয়েছি। কিন্তু কোনো চাকরিতেই টিকতে পারিনি। হয়তো আমার শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে বাদ পড়েছি। চাকরির জন্য অনেক মানুষের কাছে গিয়েছি, অনেক জায়গায় ঘুরেছি; কিন্তু চাকরি জোটেনি।’

দুখু মিয়া আরও বলেন, ‘স্কুল প্রতিষ্ঠার আগে আমি প্রাইভেট পড়াতাম। সেখান থেকে আয় করে সংসার চালানোর পাশাপাশি কিছু টাকা সঞ্চয় করতাম। সেই সঞ্চয়ের টাকা ও অল্প কিছু জমি বিক্রি করে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করি। শুরুতে আমার শিক্ষার্থী ছিল ৩৩ জন। বর্তমানে শিক্ষার্থী ১৪৫ জন। এখানে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। এই স্কুল থেকে পড়াশোনা করে অনেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন জায়গায় ভালো অবস্থানে রয়েছে।’

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলতাফ হোসেন। ছবি: আজকের পত্রিকা

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ‘অনুপ্রেরণা’

স্কুলের সহকারী শিক্ষক মাহি বলেন, ‘দুই হাত না থাকা সত্ত্বেও তিনি স্কুলটি পরিচালনা করছেন। তিনি তাঁর সর্বোচ্চ মেধা ও শ্রম দিয়ে স্কুলটি পরিচালনা করছেন। আমি মনে করি, এই স্কুলের সব শিক্ষার্থীর জন্য তিনি অনুপ্রেরণা। স্যারের দুই হাত নেই, তবু তিনি যদি এত কিছু করতে পারেন, তাহলে আমরা কেন পারব না?’

স্কুলের শিক্ষার্থী রুনা বলে, ‘আমাদের দুখু মিয়া স্যার খুব ভালো পড়ান। তিনি আমাদের অনেক আদর-যত্ন করেন। তিনি অনেক ভালো মানুষ ও ভালো শিক্ষক। তিনি হাত দিয়ে লিখতে না পারলেও পা দিয়ে লিখে পড়ান। তাঁর লেখা ও পড়ানো আমরা ভালোভাবে বুঝতে পারি। স্কুলটি যেন ভালোভাবে চলে ও সুনাম অর্জন করে, সেই দোয়া করি। আমরাও ভালোভাবে পড়াশোনা করে স্কুলের সুনাম করতে চাই।’

ভালোভাবে স্কুলটি চালাতে চান সহযোগিতা

আর্থিক সংকটের কারণে স্কুলে খুব ভালো মানের শিক্ষক রাখতে পারছেন না জানিয়ে দুখু মিয়া বলেন, ‘আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে শিক্ষার্থীদের শেখানোর চেষ্টা করি। কেউ যদি এই স্কুলের শিক্ষার মান আরও উন্নত করতে একটু সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন, তবে আমি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।’

দুখু মিয়ার তৃতীয় ছেলে ও স্কুলের সহকারী শিক্ষক মো. মোহাইমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। আব্বা যখন ২০০৭ সালে স্কুলটি শুরু করেন, তখন আমাদের অনেক অভাব-অনটন ছিল। জমানো টাকা দিয়ে স্কুল শুরু করা সম্ভব হচ্ছিল না। তখন আব্বুর একটি জমি ছিল, সেটি বিক্রি করে স্কুলটি শুরু করেন। আমরা এখনো খুব ভালোভাবে চলছি—এ কথা বলব না। তবে আলহামদুলিল্লাহ, মোটামুটি ভালো আছি। দুই হাত না থাকা অবস্থায় একজন মানুষ সাধারণত যত দূর আসতে পারেন, তার চেয়ে অনেক দূর এসেছেন আমার আব্বু। তিনি অত্যন্ত পরিশ্রমী একজন মানুষ। এখনো সংগ্রাম করে যাচ্ছেন।’

স্থানীয় বাসিন্দা কাউছার মিয়া বলেন, ‘তাঁর দুই হাত না থাকলেও ইচ্ছাশক্তির কোনো কমতি নেই। জীবনে তিনি অনেক পরিশ্রম করেছেন। আমরা আশাবাদী, তিনি আরও সফল হবেন। তিনি আমাদের সমাজের অনুপ্রেরণা ও গর্ব। অনেকের দুই হাত থাকার পরও যা করতে পারেননি, তিনি দুই হাত না থাকলেও তা করে দেখিয়েছেন।’

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মুহা. শাহনুর জামান বলেন, ‘আমি এখানে নতুন এসেছি। তবে এ বিষয়ে এখনো কিছু জানি না। খোঁজ নিয়ে বিষয়টি দেখব। যদি কোনোভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করা যায়, সে বিষয়ে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’