মাত্র ২০ বছর বয়সে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে প্রবাসের কঠিন কর্মযজ্ঞে নেমেছিলেন ফাহিম। দীর্ঘ ৮ বছরে একটি বারের জন্যও ছুটি নিয়ে দেশে আসতে পারেননি, মেলেনি মায়ের কোলে মাথা রাখার সুযোগ। পরিবারের পরিকল্পনা ছিল এবার তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিয়ে দেবে। কনে দেখাও চলছিল। কিন্তু উৎসবের আলো জ্বলে ওঠার আগেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল জীবন, পরিবার, ভবিষ্যৎ সবই।
গতকাল সোমবার স্থানীয় সময় দিবাগত রাত ৩টার দিকে দক্ষিণ আফ্রিকার কুইন্সটাউনে নিজ কর্মস্থলে অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন ফাহিম সরকার (২৮)। এ ঘটনায় তাঁর আরও পাঁচ সহকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। নিহত ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনই নারায়ণগঞ্জ জেলার এবং একজন মুন্সিগঞ্জ জেলার বাসিন্দা। নিহত ফাহিম সরকার নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার আলীরটেক ইউনিয়নের ক্রোকেরচর গ্রামের মনির সরকারের ছেলে।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে ফাহিমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে ভারী হয়ে আছে চারপাশ। বাড়ির ভেতরে প্রবেশের সুযোগ না থাকলেও বাইরে থাকা প্রতিবেশী ও স্বজনরা ফাহিমের সম্পর্কে জানান, দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকা স্থানীয় ইউপি সদস্য রওশন মেম্বারের সুপারশপে কর্মী হিসেবে কাজ করতেন ফাহিম। দীর্ঘ সময়ের এই কর্মজীবনে তিনি ছুটি নিয়ে দেশে আসতে পারেননি। পরিবারের পরিকল্পনা ছিল এবার তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিয়ে দেবে।
ফাহিমের ছোট বোনের স্বামী দ্বীন ইসলাম বলেন, ‘সাত বছর আগে ফাহিমের বোনকে বিয়ে করেছি আমি। এখন পর্যন্ত কোনদিনও সামনা সামনি দেখা হয়নি তাঁকে। সম্প্রতি তাঁর বিয়ের কথা চলছিলো। তাঁর বোনও পাত্রী দেখছিলো নানান স্থানে। এরই মধ্যে এই দুর্ঘটনা ঘটে গেলো। লাশেরও নাকি অস্তিত্ব নেই। কিভাবে কি করবো আমরা বুঝতে পারছি না।’
একই গ্রামের আরেক নিহত আপন আহমেদের পৈত্রিক বাড়ি ক্রোকেরচর গ্রামের বাজারসংলগ্ন ধলেশ্বরী নদীর কাছে। কয়েক বছর আগে রওশন মেম্বারের পরামর্শে তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন আপন। ছেলের পাঠানো টাকায় কিছুদিন পরই বাবা আলী মিয়া বাড়ির কাজ শুরু করেন। তবে নতুন বাড়িতে আর ওঠা হলো না আপনের।
আলী মিয়া আহাজারি করতে করতে বলেন, ‘আমার পোলায় আর ফিরবো না। আমি এই বাড়িতে কেমনে থাকমু? আমার পোলার বাড়িতে আর পোলায় আইবো না।’
আপনের মামা বলেন, ‘আমরা চাই সরকার দ্রুত মরদেহ শনাক্ত করে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করুক। অন্তত ছেলের কবরটা ঘরের পাশে থাকবে, এটা স্বজনরা সবাই চায়। এখন শুনতে পাচ্ছি লাশ নাকি পুড়ে কঙ্কাল হয়ে গেছে। সরকার যেন এই পরিবারগুলোর মানবিক দিক বিবেচনা করে মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থাটা করে।’
মারা গেছেন একই গ্রামের নূর মোহাম্মদও (৫১)। তিনজনের মৃত্যুর খবরে পুরো ক্রোকেরচর গ্রাম জুড়ে এখন শোকের কালো মেঘ। গ্রামবাসী চান, সরকার উচ্চ পর্যায়ে কথা বলে সেখানকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিক।