শিক্ষার মানোন্নয়নের চেষ্টা হয়তো সব স্কুলের প্রধান শিক্ষকেরই আছে। কিন্তু শিক্ষার্থীর সক্ষমতার জায়গাটা খুঁজে দেখেন শিক্ষক বিলকিস। সেই অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের সহায়ক পরিবেশ, অধিক মনোযোগ ও অতিরিক্ত পরিচর্যা নিশ্চিত করেন। এখানেই তাঁর বিশেষত্ব। এ কারণেই আজ সোনারগাঁর ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দেশের ভালো স্কুলগুলোর কাতারে নাম লিখিয়েছে। আর বি আর বিলকিস হয়েছেন দেশ সেরা প্রধান শিক্ষক।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের চূড়ান্ত মূল্যায়নে শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদান, বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং দক্ষ প্রশাসনিক নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এই গৌরবময় পদকে ভূষিত করা হয়। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে পদক গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি ১২ বার সোনারগাঁ উপজেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক এবং ৮ বার নারায়ণগঞ্জ জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়াও তিনি ঢাকা বিভাগে দুই বার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন।
এই গৌরবময় অর্জনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বি. আর. বিলকিস বলেন, ‘যেকোনো কাজের স্বীকৃতিই আনন্দের। এই অর্জন শুধু আমার একার নয়; এটি আমার বিদ্যালয়ের সব শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সোনারগাঁ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। এই সম্মাননা আমাকে ভবিষ্যতে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান আরও বৃদ্ধি করতে এবং শিশুদের মেধা বিকাশে আরও বেশি নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগাবে।’
ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে বি. আর. বিলকিস দীর্ঘদিন ধরে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তার সুনিপুণ পরিচালনায় বিদ্যালয়টি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বারবার প্রশংসিত হয়েছে।
ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার কমানো, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং শিক্ষার্থীদের সহ-শিক্ষা কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে তিনি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
আজ রোববার সকালে স্কুলটিতে গিয়ে দেখা গেল, প্রতিদিনের মতো ঘড়ির কাঁটা ৯টা ছুঁতেই বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে দাড়িয়ে বাশিঁ বাজিয়ে সারিবদ্ধভাবে শিক্ষার্থীদের ভেতরে প্রবেশ করাচ্ছেন প্রধান শিক্ষক বিলকিস। এর পরই শুরু হচ্ছে শিক্ষার্থীদের জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও শারীরিক কসরত। শিক্ষার্থীরা শ্রেনী কক্ষে যাওয়ার পর শিক্ষকদের নিজ দায়িত্বে পাঠদানের জন্য শ্রেনী কক্ষে পাঠাচ্ছেন এবং প্রতিটি ক্লাসের খোঁজ নিচ্ছেন।
তিনি ১৯৯৩ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পরে আবারও পরীক্ষার মাধ্যমে ২০০৩ সালে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পান। তিনি সোনারগাঁয়ের সাদিপুর ইউনিয়নের কোনাবাড়ি গ্রামে জন্ম। উপজেলার পঞ্চমীঘাট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও রাজধানীর লালমাটিয়া কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকত্তোর করেন।
বিলকিস বলেন, ‘বর্তমান ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক হাজার ২০ জন। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশ। বিদ্যালয়ের ১৩ জন শিক্ষক রয়েছেন। শিক্ষার্থীদের পড়া লেখা ক্লাসেই বাস্তবায়ন করা হয়। শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য শিক্ষকদের মাধ্যমে বছরের শুরুতে তিন স্তরের শিক্ষার্থী বাছাই করা হয়। যেমন উত্তম, মধ্যম ও পিছিয়ে পড়া। যারা পিছিয়ে পড়া তাদের নিয়ে বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করা। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৯৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়তে ও লিখতে পারে। প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ করা হয়। অভিভাবকেরা ও সহায়তা করে থাকেন। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক হিসেবে রয়েছে সততা স্টোর ও পরামর্শ বক্স।’
এছাড়াও তিনি পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষক সংখ্যা অনুযায়ী ভাগ করে দিয়েছেন, যাতে তাদের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয়। রাতে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়াশোনার খোঁজ নেন। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য উপকরণ দিয়ে থাকেন। প্রতিটি শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, গান, ব্যায়াম ও গল্পবলা চর্চা করা হয়। বিদ্যালয়ে বাংলা, ক্লাব, গণিত ক্লাব, ইংরেজি ক্লাব করে অলিম্পিয়াডের আয়োজন করা হয় এবং বিজ্ঞান মেলার আয়োজন করা হয়। প্রতি শনিবারে শিক্ষক ও অভিভাবকদের নিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হয়। বিদ্যালয়ের শ্রেণিভিত্তিক ম্যসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বাড়ির কাজ দেওয়া হয়, যাতে শিক্ষার্থীরা স্কুল থেকে লিখে না নিলেও অভিভাবকেরা বুঝতে পারেন।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক শামীমা আক্তার বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকের শ্রেষ্ঠ হওয়ার পেছনে রয়েছে শৃঙ্খলা। তিনি শিক্ষাবান্ধব শিক্ষক। সময়ের কাজ সময়ে করতে পছন্দ করেন। আমরাও তাঁর মতো হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। তিনি বিদ্যালয়ের সময়ের বাইরে নিজের জন্য সময় না দিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য সময় ব্যয় করেন। তাঁর কারণেই ২০২৫ সালে বিদ্যালয় থেকে ৩৪ জন অংশ নিয়ে ৩০ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পায়।’
শিক্ষক মাহামুদা আক্তার বলেন, ‘তিনি এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং এখন এই বিদ্যালয়েরই প্রধান শিক্ষক হয়েছেন। আমার চোখে দেখা একজন কঠোর পরিশ্রমী শিক্ষক। তিনি সব সময় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নে ইনোভেটিভ চিন্তা করে থাকেন। শিক্ষকদের নিয়ে সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক সভা করেন। শিক্ষাব্যবস্থা কীভাবে আরও ফলপ্রসূ করা যায়, তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করেন। শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষার জন্য চিন্তাভাবনা করেন।’
শিক্ষার্থীরা জানায়, তাদের খুব ভালোবাসেন। বিদ্যালয়ে ভাষা ক্লাব, বাংলা ক্লাব, গণিত ক্লাব, ইংরেজি ক্লাব পরিচালনা করেন। বিদ্যালয়ে ছাদ বাগান করেন এবং তাদের খুব যত্ন করেন। তারাও প্রধান শিক্ষককে ছাদ বাগান করা ও স্কুল পরিচ্ছন্নতার কাজে সহযোগিতা করে।
প্রসঙ্গত, প্রতি বছর প্রাথমিক শিক্ষার মাঠপর্যায়ের কাজের গতিশীলতা আনা, মানোন্নয়ন এবং শিক্ষকদের কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে এই জাতীয় শিক্ষা পদক প্রদান করা হয়। উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের গণ্ডি পেরিয়ে চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের পর জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করা হয়।