হোম > সারা দেশ > নওগাঁ

নওগাঁয় জমি নিয়ে বিরোধে প্রাণহানি: ঘটনায় না থেকেও আসামি সাংবাদিক, চেনেন না বাদী

মিঠু হাসান, বদলগাছী (নওগাঁ)

সাংবাদিক রাসেল রানা। ছবি: সংগৃহীত

নওগাঁর বদলগাছীতে সরকারি অর্পিত (ভিপি) জমির দখল নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে মাসুদ রানা (৩৫) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ১৫ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন নিহত ব্যক্তির ছোট ভাই রিফাত হোসেন। মামলার ১৫ নম্বর আসামি করা হয়েছে স্থানীয় এক সাংবাদিককে। তবে ওই সাংবাদিকের দাবি, সংঘর্ষের সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। এমনকি মামলার বাদীও বলেছেন, ওই সাংবাদিককে তিনি চেনেন না।

এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকা একজন সাংবাদিকের নাম হত্যা মামলায় কীভাবে এল। সাংবাদিক রাসেল রানার দাবি, স্থানীয় বিএনপি নেতা ও বালুভরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আল এমরানের সঙ্গে আগের সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরোধের জেরেই তাঁকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আল এমরান।

১০ সেপ্টেম্বর বদলগাছী উপজেলার বালুভরা ইউনিয়নের বারাতৈল গ্রামের খোর্দ্দ ভুবন মৌজায় ভিপি জমির দখল নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষের ১০ থেকে ১২ জন আহত হন। তাঁদের মধ্যে গুরুতর আহত মাসুদ রানা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ সেপ্টেম্বর সকালে মারা যান।

মাসুদ রানা বালুভরা ইউনিয়নের আফজাল হোসেনের ছেলে। তাঁর মৃত্যুর পর ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে বদলগাছী থানায় ১৫ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন তাঁর ছোট ভাই রিফাত হোসেন।

মামলার ১৫ নম্বর আসামি করা হয়েছে টাইমস টুডের নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি ও দৈনিক জাতীয় অর্থনীতির নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি রাসেল রানাকে।

রাসেল রানার দাবি, সংঘর্ষের সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। ঘটনাস্থল থেকে তাঁর বাড়ির দূরত্বও প্রায় ১৫ কিলোমিটার। বিভিন্ন সময়ে বালুভরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি আল এমরানের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করায় তাঁকে হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে বলে দাবি তাঁর।

তাঁকে কেন মামলায় আসামি করা হয়েছে—এ প্রশ্নের জবাবে মামলার বাদী রিফাত হোসেন বলেন, ‘মামলার ১৫ নম্বর আসামি রাসেল রানাকে আমি চিনি না।’

ঘটনার সময় তাঁর ভাইকে কারা মারধর করেছেন—এ বিষয়ে রিফাত বলেন, ‘আমার সামনেই আমার ভাইকে চারজন মিলে মারছিল। তাদের মধ্যে রাজা, জাহাঙ্গীর, কুদ্দুস ও ফটিক ছিল। আমি সাংবাদিক রাসেল রানাকে চিনি না।’

ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না—এমন একজন সাংবাদিকের নাম হত্যা মামলায় কীভাবে এল—জানতে চাইলে রিফাত বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে বালুভরার এমরান চেয়ারম্যান ও আমার চাচা ভুট্টু ছিলেন। মামলায় তাঁর নাম কে দিল, আমি জানি না।’

মামলার এজাহার কপি। ছবি: সংগৃহীত

বাদীর এই বক্তব্যের পর মামলায় সাংবাদিককে আসামি করার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয়দের মধ্যে গুঞ্জন এবং সাংবাদিক রাসেল রানার দাবি, আল এমরানের নির্দেশেই তাঁকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। এর পেছনে আগের সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে চেয়ারম্যানের সঙ্গে তাঁর বিরোধের বিষয়টিও সামনে এসেছে।

তবে এ অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন আল এমরান। তিনি বলেন, ‘ভিপি জমি নিয়ে দুই পক্ষের মারামারি হয়েছে। উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হয়েছে। এর মধ্যে গুরুতর আহত হয়ে মাসুদ রানা মারা গেছে। সাংবাদিক রাসেল রানাকে আমার নির্দেশে মামলায় আসামি করা হয়েছে—এমন অভিযোগের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। কে কাকে আসামি করেছে, তা আমার জানা নেই।’

মামলার বাদীর সঙ্গে তিনি থানায় গিয়েছিলেন—এমন বক্তব্যও অস্বীকার করেন আল এমরান।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বারাতৈল গ্রামের খোর্দ্দ ভুবন মৌজায় প্রায় ১৪ বিঘা সরকারি অর্পিত জমি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আসামিপক্ষের কয়েকজন কৃষক ওই জমি লিজ নিয়ে চাষাবাদ করে আসছিলেন।

চলতি বছর নিহত মাসুদ রানা, তাঁর বাবা আফজাল হোসেন ও ভাই রিফাত হোসেনের পক্ষ থেকেও ওই জমি লিজ নেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়। তবে চলতি বছর কোনো পক্ষই জমির লিজ পায়নি। পুরোনো চাষাবাদের সূত্রে আসামিপক্ষ জমিতে ফসল আবাদ করে আসছিল। পরে জমির দখল নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। একপর্যায়ে জমিতে থাকা ফসল নষ্ট করার অভিযোগ ওঠে। এর জের ধরে ১০ সেপ্টেম্বর সকালে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।

মামলার কয়েকজন আসামির বাড়িতে গিয়ে তাঁদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাঁদের পাওয়া যায়নি। তবে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেন, সংঘর্ষের সময় রাসেল রানা ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তাঁকে তাঁরা ব্যক্তিগতভাবেও চেনেন না বলে জানান।

বদলগাছী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, এ ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

হত্যা মামলায় একজন সাংবাদিককে কীভাবে আসামি করা হলো—জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘মামলাটি তদন্তাধীন। এ বিষয়ে বাদী ভালো বলতে পারবেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাংবাদিক রাসেল রানার বিরুদ্ধে তদন্তে হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতা না পাওয়া গেলে অভিযোগপত্রে তাঁর নাম বাদ দেওয়া হতে পারে।’