ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের উপজেলা শাখার এক বছর মেয়াদি নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ ঘটনায় আর্থিক লেনদেন, বিবাহিত ও অছাত্রদের পদায়নের অভিযোগ তুলে ঝাড়ুমিছিল করেছেন পদবঞ্চিত নেতারা। এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (ফেসবুক) ছড়িয়ে পড়েছে। ওই মিছিলের ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ মানুষের মাঝে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। তবে পুলিশ বলছে, বিষয়টি তাদের জানা নেই।
আজ মঙ্গলবার সকালে উপজেলার ঈশ্বরগঞ্জ আঠারবাড়ি সড়কে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের ঝাড়ুমিছিলটি হয়।
এদিকে মিছিলের ভিডিওটি বিকেল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, মুখোশ পরিহিত ছাত্রলীগের ২০-২৫ জন নেতা-কর্মী স্লোগান দিচ্ছেন। স্লোগানে বলা হচ্ছে—‘আল-আমিনের দুই গালে, জুতা মারো তালে তালে’। কমিটি গঠনে আর্থিক লেনদেন, বিবাহিত ও অছাত্রদের পদায়নের অভিযোগ তুলে ঝাড়ুমিছিলটিতে এমন স্লোগান দেওয়া হয়।
আরিফ ইমরান নামের একজন ঝাড়ুমিছিলের ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে লেখেন, ‘ছি, ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের জন্য এটা লজ্জার। এই দুঃসময়ে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে কমিটি বাণিজ্যের জন্য ঝাড়ু মিছিল হয়। এটা আমাদের জন্য লজ্জার, ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের প্রত্যেক কর্মীর জন্য লজ্জা, ছি।’
২.০ লোডিং পেজে ভিডিওটি পোস্ট করে লেখা হয়, ‘ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটির সভাপতি ক্যাসিনো সম্রাট শেখ অলিউল্লাহ রাসেল ও সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির সায়মনকে অবাঞ্চিত ঘোষণা ও জেলা ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী বিক্ষোভ ঝাড়ু মিছিল অনতিবিলম্বে জেলা ও উপজেলা কমিটি বিলুপ্ত চাই।’
সূত্র জানায়, গত ৩০ জুলাই ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করা হয়। ছাত্রলীগের ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতি মোহাম্মদ আল-আমিন ও সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন কবিরের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের এক বছর মেয়াদি নতুন কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শেখ অলিউল্লাহ রাসেলকে ফের সভাপতি ও আলমগীর কবির সায়মনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। এ ছাড়া সহসভাপতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
কমিটি ঘোষণার কিছু সময়ের মধ্যেই সহসভাপতি পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে একটি স্ট্যাটাস দেন ঈশ্বরগঞ্জ পৌর ছাত্রলীগের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাসান সিজান। তিনি বলেন, ‘আমাকে সম্পূর্ণ অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের কথা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যে কমিটি করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। আমি আমার ব্যক্তিত্ব ও আত্মসম্মান রক্ষার্থে এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে পদত্যাগ করেছি। আগামী দিনে আমি শেখ হাসিনার কর্মী হয়ে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে বদ্ধপরিকর। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে কমিটেড ছিলাম, আছি এবং আমৃত্যু থাকব।’
একইভাবে সহসভাপতি পদে থাকা অর্ণব হোম চৌধুরীও ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তিনি দাবি করেন, বিবাহিত হওয়ায় সাংগঠনিক নীতিমালা অনুযায়ী ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ নেই। এ ছাড়া তাঁর অজান্তেই ভুলক্রমে নতুন কমিটিতে নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন তিনি।
এদিকে প্রকাশিত কমিটিতে সভাপতি পদপ্রত্যাশী ছাত্রলীগ নেতা রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করে ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর থেকে যারা আত্মগোপনে ছিলেন এবং সংগঠনের কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেননি, তাদের মধ্যে কয়েকজনকে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে পদ দেওয়া হয়েছে।’
রফিকুল ইসলাম আরও লেখেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের জন্য কাজ করা ত্যাগী নেতা-কর্মীরা মূল্যায়ন পাননি। এ ছাড়া নবগঠিত কমিটিতে বিবাহিত ও অছাত্র ব্যক্তিদেরও পদ দেওয়া হয়েছে, যা সংগঠনের নীতিমালার পরিপন্থী।’
কমিটি ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে নানা সমালোচনা দেখা গেছে। অনেকেই কমিটিতে বিবাহিত, অছাত্র ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ তুলে ফেসবুক স্ট্যাটাসে কমিটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
নতুন কমিটিতে সভাপতির দায়িত্ব পাওয়া শেখ অলিউল্লাহ রাসেল নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া স্ট্যাটাসে বলেন, ‘পদটা বড় নয়, দায়িত্বটাই বড়। আবারও ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পেয়ে আমি গর্বিত। এ জন্য ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. আল-আমিন ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। তার দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতা ছাড়া এটি সম্ভব হতো না। ঈশ্বরগঞ্জের প্রতিটি ছাত্রের পাশে ছিলাম, আছি এবং ভবিষ্যতেও থাকব।’
নবগঠিত কমিটিতে আর্থিক লেনদেন, বিবাহিত ও অছাত্রদের পদায়নসহ উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগ বা নবগঠিত ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঈশ্বরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল আজম বলেন, ‘ঝাড়ুমিছিলের বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে খোঁজ নিয়ে শিগগির তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’