ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলায় অগ্নিকাণ্ডের পর রোগী ও স্বজনদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। আগুনের সময় হুড়োহুড়ি করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে হতাহতের দাবি ওঠে। একপর্যায়ে ছয়জনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লেও পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অগ্নিকাণ্ডে কেউ মারা যায়নি। এর কিছুক্ষণ পর পুলিশের পক্ষ থেকে আবার দুজনের প্রাণহানির তথ্য প্রাথমিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে বলে জানানো হয়। ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ও কারণ নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
সোমবার সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলায় আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে ধোঁয়া। আতঙ্কিত হয়ে পড়েন রোগী, স্বজন, চিকিৎসক ও হাসপাতালের কর্মীরা। আগুনের খবর ছড়িয়ে পড়লে অনেকে দ্রুত নিচে নামতে শুরু করেন। এ সময় সিঁড়িতে হুড়োহুড়ির সৃষ্টি হয়।
এর মধ্যেই ছয়জনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বার্তা পাঠিয়ে হাজেরা বেগম, শাহজাহান, রমজান, জাহানারা, কুলসুমা ও অজ্ঞাত এক শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওই তথ্য নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য দেওয়া হয়।
রাত ১টার দিকে বিভাগীয় কমিশনার এসএম হুমায়ূন কবির সরকার সাংবাদিকদের জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কেউ মারা যাওয়ার প্রমাণ তাঁরা পাননি।
তিনি বলেন, হাসপাতালের রেজিস্টার, জরুরি বিভাগের চিকিৎসক, নার্স, ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিভাগীয় কমিশনার বলেন, ‘পদদলিত হয়ে ছয়জন মারা গেছেন—এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ আমরা এখন পর্যন্ত পাইনি। আমরা ফায়ার সার্ভিস, জরুরি বিভাগের চিকিৎসক, নার্স ও অন্য কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁদের রেজিস্টারও যাচাই করেছি। পদদলিত হয়ে মৃত্যুর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’
তিনি জানান, মৃতের তালিকায় থাকা একজন এখনো জীবিত এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাকি চারজনের মধ্যে দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলে তাঁদের পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত করেছেন। অপর দুজনের মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্তের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।
তবে এর কিছুক্ষণ পরই, রাত দেড়টার দিকে রেঞ্জ ডিআইজির মিডিয়া শাখার মেসেঞ্জার গ্রুপে প্রাথমিকভাবে দুজনের প্রাণহানির সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানানো হয়।
এরপর মৃত দাবি করা আহত জাহানারাকে সাংবাদিকদের সামনে আনা হয়। এ সময় জাহানারা তাঁর ভাইয়ের মৃত্যুর বর্ণনা দিতে চাইলে তাঁকে কথা বলতে দেওয়া হয়নি।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের পর আতঙ্কে রোগী ও স্বজনদের দৌড়াদৌড়ির সময় সিঁড়িতে পড়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন তাঁদের স্বজনেরা। তাঁরা হলেন তারাকান্দার বালিখা গ্রামের শহিদুল ইসলামের স্ত্রী কুলসুম আক্তার (৩৫) এবং ফুলপুরের রাঙামাটিয়া ইউনিয়নের বিষ্ণুরামপুর গ্রামের শাহাজাহান মনির (৪৫)।
সোমবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে কুলসুম আক্তারের ননদ নাজমা আক্তার বলেন, কুলসুম ১২ দিন ধরে জন্ডিসে আক্রান্ত ১২ বছর বয়সী ছেলে স্বাধীনকে নিয়ে হাসপাতালের ৩১ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ১৮ বছর বয়সী মেয়ে মিমও।
নাজমার ভাষ্য, আগুন লাগার পর হাসপাতালের ভেতরে লোকজন ছোটাছুটি শুরু করলে কুলসুম ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করেন। মিম আগে বের হয়ে যায়। পরে ফিরে এসে দেখে, লোকজন তাঁর ভাই স্বাধীনকে টেনে বের করছেন; কিন্তু মাকে পাওয়া যাচ্ছে না।
পরে কুলসুমকে উদ্ধার করে অক্সিজেন দেওয়া হয়। তখনো তাঁর নিঃশ্বাস ছিল বলে দাবি করেন নাজমা। খবর পেয়ে তিনি হাসপাতালে আসার পথে ছিলেন। এর মধ্যেই কুলসুমের মৃত্যু হয়। নাজমা বলেন, ‘আমাদের অভিযোগ আছে।’ হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে তাঁরা মরদেহ বাড়িতে নিয়ে গেছেন বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে শাহাজাহান মনির প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন ধরে হাসপাতালের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় যক্ষ্মার চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তাঁর ছেলে পলাশ মোল্লার দাবি, আগুন লাগার সময় তাঁর বাবা, মা হারিসা আক্তার ও খালা জাহানারা আক্তার একসঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলেন। এ সময় পেছন থেকে লোকজনের ধাক্কায় তাঁরা পড়ে যান।
পরে তাঁর মা ও খালাকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁরা বর্তমানে হাসপাতালের ১০ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। পলাশ জানান, ঘটনার সময় তিনি হাসপাতালে ছিলেন না। পরে এসে মায়ের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর বাবার মরদেহ স্বজনেরা বাড়িতে নিয়ে গেছেন। মুঠোফোনে বাবার মরদেহের ছবিও দেখেছেন বলে জানান তিনি।
মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তির আরেকটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে হাসপাতালের একটি তালিকা। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সহসভাপতি আবু ওয়াহাব আকন্দ জানান, তালিকায় মৃত হিসেবে থাকা একজন এখনো জীবিত এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
তিনি বলেন, ‘জাহানারা নামে যে রোগীর নাম মৃতের তালিকায় দেওয়া হয়েছে, তিনি জীবিত। তিনি এখনো চিকিৎসা নিচ্ছেন। তালিকার সঙ্গে বাস্তবতা মিলিয়ে দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।’
অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতালের দুটি সিঁড়ির মধ্যে একটি বন্ধ থাকায় রোগী ও স্বজনেরা একটি সিঁড়ি দিয়ে বের হওয়ার সময় হুড়োহুড়ির মধ্যে পড়েন—এমন অভিযোগও উঠেছে।
এ বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার জানান, বিষয়টি তাঁরা জেনেছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার কারণে কিছু সিঁড়ি বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছে। তবে এতে কোনো অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
আগুনের পর হুড়োহুড়িতে কয়েকজন আহত হওয়ার কথাও স্বীকার করেছে প্রশাসন। কারও হাত-পা কেটে যাওয়া কিংবা মাথায় আঘাত লাগার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে বলে জানান বিভাগীয় কমিশনার। তবে ধোঁয়ায় কারও মৃত্যু হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী জানান, নতুন ভবনের অষ্টম তলার লিফট কন্ট্রোল রুমে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় ৩০ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
অগ্নিকাণ্ডের পর মৃত্যুর সংখ্যা, মৃত্যুর কারণ এবং হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার কোনো চিত্র পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্তের ফলাফল না আসা পর্যন্ত হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা ও মৃত্যুর কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছে।